বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার চাপে ভাঙল ১৬০ ফিট প্রাচীর

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪৫ পিএম

দেশের একমাত্র ভূ-গর্ভস্থ দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদিত কয়লা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গ্রহণ না করায় খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুদ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকাল ৯টায় কয়লার আগুনের ধোঁয়ায় পানি দেওয়ার পর খনির কোল ইয়ার্ডের পশ্চিমে প্রাচীরের ১৬টি পিলারসহ প্রায় ১৬০ ফুট প্রাচীর ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে সেখানে খনি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। 

খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা সংরক্ষণের জন্য বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উপরিভাগে তিনটি কোল ইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে একটিতে রয়েছে সেডিমেন্ট কয়লা। বাকি দুটি ইয়ার্ডে কয়লার ধারণক্ষমতা ২ লাখ মেট্রিক টন। যার মোট আয়তন প্রায় ১৫ একর। ইতোমধ্যেই সেখানে ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন কয়লার মজুত গড়ে উঠেছে। কিন্তু বর্তমানে ৩টি ইয়ার্ডে মজুদ উচ্চতা গড়ে ২০ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন মজুদ করে রাখা আছে। যা মজুত ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।

অপরদিকে, পিডিবির কোল ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে মজুদ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। ফলে, খনির কোল ইয়ার্ডে মজুদ উচ্চতা স্বাভাবিক সীমার তিন গুণ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে, যা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করেছে।

গত ৯ আগস্ট থেকে ১৪০৬ নম্বর ফেইস থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। ইতিমধ্যে এই ফেইস থেকে প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আরও ১ লাখ মেট্রিক টন উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নতুন ১৩০৯ নম্বর ফেইসে কয়লা উত্তোলন শুরু হবে।

কয়লা খনি থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার কয়লা উত্তোলন হচ্ছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা গ্রহণ করায় মজুতের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

সূত্রটি জানায়, ভূগর্ভে মিথেন গ্যাসের আধিক্যের কারণে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। ভূগর্ভের আগুন ভূপৃষ্ঠের সাধারণ আগুনের মতো নয়। পানি দিয়ে এই আগুন নেভানো সম্ভব নয়। আগুন নেভানোর পাইপ স্থাপন করে নাইট্রোজেন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, ১২ নভেম্বর থেকে পিডিবি কোনো কয়লা গ্রহণ করেনি। যে কোনো সময় বাধাগ্রস্ত হতে পারে কয়লা খনির উত্তোলন কার্যক্রম। খনি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, কয়লা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হলে খনিতে বিপর্যয় দেখা দিবে।

উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের এনামুল হক বলেন, প্রতিদিন কয়লার স্বতঃস্ফূর্ত প্রজ্বলন হচ্ছে। মজুত বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত পানি প্রয়োগ করাও দুষ্কর হয়ে পড়ছে। খনি এলাকাবাসীর জন্য ক্ষতিকারক গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। ফলে চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩নং ইউনিটটির গভর্নর ভাল্ব স্টিম সেন্সর-এর ৪টি টারবাইন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গত ১৬ অক্টোবর রাত ৮টা ৩৫ মিনিট থেকে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১নং ইউনিটটি গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে বয়লার পাইপ ফেটে বন্ধ হয়ে যায়। বয়লার পাইপ মেরামত করে এক সপ্তাহ পর গত ২৬ অক্টোবর রাত ৭টা ১৯ মিনিটে আবার চালু করা হয় ১নং ইউনিটটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কিন্তু এর একদিন পর বিয়ারিংয়ের টেম্পারেচার সেন্সর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং কিছু বাল্ব অকেজো হয়ে পড়ায় গত ২৭ অক্টোবর রাত ৯টা ১৪ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায় সর্বশেষ চালু থাকা ১নং ইউনিটটি। ফলে ২৭ অক্টোবর রাত থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।

আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিটটির মেজর ওভারহলিং কাজের জন্য বন্ধ থাকবে।

১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১নং ইউনিটও বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও অনিয়মিত। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে প্রায়ই বন্ধ থাকে।

বর্তমানে কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১নং ইউনিট থেকে ৪০-৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ১ নম্বর ইউনিটটি চালু রাখতে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন।

খনি সূত্র বলেছে, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত খনি কর্তৃপক্ষ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কয়লা বিক্রি করেছে। কিন্তু ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় ইউনিট চালু হওয়ার পর খনির উৎপাদিত পুরো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ শুরু হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্থানীয় পর্যায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি। ২০১৯ সাল থেকে শুধু পিডিবি’র কাছে কয়লা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২০১৯ সাল থেকে শুধু বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ শুরু করে খনি কর্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আবু তালেব ফারাজি বলেন, প্রতিদিন খনির অভ্যন্তর থেকে কয়লা ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন উত্তোলন হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে দৈনিক ৫শ' থেকে ৬শ' মেট্রিক টন কয়লা গ্রহণ করায় প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার মেট্রিক টন কয়লা জমা হচ্ছে। কয়লা গ্রহণ করার জন্য লিখিতভাবে ও বিভিন্ন সময়ে মৌখিকভাবে জানানো হয়। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যাপ্ত কয়লা গ্রহণ করতে পারছে না।

এবিষয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় কয়লা সরবরাহ কমেছে। তবে, জানুয়ারি মাসে ৩য় ইউনিট চালু হলে এ সমস্যা থাকবে না। বর্তমানে কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১নং ইউনিট থেকে ৪০-৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত