গত দশ বছরে দেশে ব্যাংক ও ব্যাংকের শাখা অনেক বেড়েছে। আর্থিক সেবা প্রদানের হার বেড়েছে দুই-তিন গুণ। তারপরও দেশের মোট জনসংখ্যা ও পরিধির তুলনায় আর্থিক সেবা প্রদানের হার পর্যাপ্ত নয়। ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিধি কিছুটা বাড়লেও ব্যাংকিং কাঠামোয় মানুষকে সেবা দেওয়া পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সব আর্থিক খাতকে ব্যাংকিং কাঠামোয় সেবা বাড়াতে মনোযোগী হওয়া দরকার। দেশে পাঁচ হাজারের বেশি অধিক ইউনিয়নের তুলনায় ৫৫টি ব্যাংকের মোট শাখা নয় হাজার। শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকের শাখা বেশি হওয়ায় অনেক ইউনিয়নে কোনো ব্যাংকের শাখা নেই। প্রতিটি ইউনিয়নে ৭০০-৮০০ পরিবার বাস করলেও একটি বা দুটির বেশি ব্যাংকের সেবা তারা পাচ্ছে না। তাই ব্যাংকিং সেবার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্ব শর্ত হলো অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি। ঋণ, সঞ্চয় ও বীমার মাধ্যমে আর্থিক সেবা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি করতে হবে। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ও শাখা বাড়লেও ব্যাংকের সঙ্গে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং, পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও ১০ টাকায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিলেও তা খুব একটা সফলতা দেখাতে পারেনি। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণসেবা নেয়, সঞ্চয় ও অন্যান্য সেবাসহ যা ৫৪ শতাংশ। এদের অধিকাংশই পেশাজীবী, উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত। তবে গ্রামীণ ব্যাংকসহ ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ছে।
ক্ষুদ্রঋণে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে। তবে ক্ষুদ্রঋণের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে তা দিয়ে ব্যবসা করে এক বছরের মধ্যে সেটা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ ও তা পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো উচিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এসেছে সাফল্য। তবে সেবার বিস্তৃতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় হচ্ছে না। এক্ষেত্রে মিলছে না সাফল্য। অধরা এ সাফল্যকে ছুঁতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ আসছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। ব্যাংকগুলোর শহর ও গ্রামে শাখা খোলার নিয়ম অনেক সময়ই মানা হচ্ছে না। তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোও এ অনুপাত মানছে না। কেন অধিক সংখ্যক মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যাচ্ছে না বা এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা কোথায়, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আর্থিক খাতের সুফল ও সংশ্লিষ্ট সেবা সমাজের পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সম্পদ বণ্টন থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে অর্থনীতির গতি বাড়বে, যা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির পথে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। ফলে মূলধন ঘাটতিসহ নানামুখী সমস্যায় পড়ছে সোনালী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বিডিবিএলসহ সরকারি মালিকানার সব ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ব্যাংকগুলো শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩ ভাগ। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর লোকসানি শাখার সংখ্যা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে করা পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্টে দেওয়া প্রতিশ্র“তিও অর্জন করতে পারেনি এসব ব্যাংক। ফলে বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকগুলো এক-চতুর্থাংশ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করতে পারেনি।
জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং বিভাগের বিভিন্ন বছরে স্বাক্ষরিত পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী নানা ক্যাটাগরির সূচকে বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি এ ব্যাংকগুলো চলতে পারছে না। কয়েকটি সূচকে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণ আদায় পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ ছয়টি ব্যাংকের কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতেই পারেনি। এমনকি কোনোটিই অর্ধেকও অর্জন করতে পারেনি।
১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে সম্ভাবনা সুপ্রচুর। অথচ আর্থিক খাতের গভীরতা ও প্রোডাক্ট বা পরিষেবা বিবেচনায় এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। যেমন খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে, কস্ট অব ডুইং বিজনেস বেপরোয়া বৃদ্ধি থামনোতে সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্স কাযকর করা যায়নি।
কারা ব্যাংকের মালিক পক্ষ, কারা বেশি বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেতেন, মন্দ ঋণ আদায়ে কারা অভিনবত্ব ও দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, প্রোডাক্ট-স্বল্পতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহনশীলতা, ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনায় কতটুকু মেধা লালন করতে পারছে, ব্যাংকিং খাতের পরিচালকদের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাবে তা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দাবিদার। মূলত পরিচালকরাই ব্যাংকের মালিক এবং তারা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন। এর একটা সুরাহা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, প্রোডাক্টের বৈচিত্র্যতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা এ তিন দিকে নজর দিতে হবে। বিকাশমান রপ্তানি ও বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থনীতিতে নিয়মকানুন সব মান্ধাতার আমলের হলে চলবে না। যেমন ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে চলার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন যুগের সমস্যা সমাধানে হিমশিম খেয়েই চলছে। আবার সবকিছুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসীম ক্ষমতার কারণে সেখানকার শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার জন্ম দিচ্ছে কিনা দেখতে হবে।
বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক কাজে বড় না হয়ে সংখ্যায় বড়। এই ব্যাংকগুলো অনেক দিন ধরে ভালোই চলছিল। কিন্তু গত ১৫ বছরে জনগণের টাকা নিয়ে ব্যাংকিং করা এসব প্রতিষ্ঠানে মালিক নামের এক শ্রেণির লোকের জমিদারি কায়েম হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিনিয়োগের প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংক ও আর্থিক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এলেও সেই ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য ক্রমাগত দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতের নানা কেলেঙ্কারির ঘটনার পেছনে রয়েছে দুর্বৃত্তদের প্রতি রাজনৈতিক প্রশ্রয়, দুর্বল ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার চর্চা ও যথাযথ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। আইনের মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কাজে মালিকরা হস্তক্ষেপ করতেন, নিজেরা নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছেন। একজন একক ব্যক্তির হাতে চলে গিয়েছিল সাতটির মতো ব্যাংক এবং তার মাধ্যমে প্রায় প্রতিটি ব্যাংক লোপাট হয়েছে। টাকা ছাপিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে সেসব ব্যাংকগুলোকে। ব্যক্তি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো না কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর যোগ থাকায় এরা সবাই প্রতিপত্তিশালী এবং ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে ছিল এদের অবস্থান। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চলমান সংকটাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো সবার এখন মোটামুটি জানা, সমাধানের উদ্যোগ তাই এখনই প্রয়োজন। স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ করে আইনগত ও কাঠামোগত সংস্কার একেবারে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও অনেক বেশি বিকেন্দ্রীকরণের কথা চিন্তা করতে হবে। বড় বড় ঋণখেলাপি আর দুর্বৃত্তকে কিছু করতে না পারলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রমেই নিজের হাতে অনেক ক্ষমতা নিয়ে আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপি ঋণে কী পরিমাণ সুবিধা দেওয়া হবে সেটা পুরোটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপর। ফলে ব্যাংক মালিকরাই ঠিক করছেন কে খেলাপি আর কে খেলাপি না। এতে করে জালজালিয়াতি, অনিয়ম আর প্রতারণাই নিয়ম হয়ে গেছে।
লেখক: সাবেক সচিব
এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান
mazid.muhammad@gmail.com