বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। এ সময় তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং আগামী বছরের শুরুতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য যাচাইয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্বিপক্ষীয় বৈঠককালে তিনি এই আগ্রহ ব্যক্ত করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা আজারবাইজানের বাকুর তেল কোম্পানিতে বাংলাদেশিদের চাকরির সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
গতকাল ছিল বিশ্ব জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলন কপ২৯-এর চতুর্থ দিন। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সকালে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গে কপ২৯ সম্মেলনের সাইডলাইনে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে ড. ইউনূস ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরালদো আলকমিনের স্ত্রী লু আলকমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করতে তার সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সফর করবে। তার সরকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উভয় দেশের জন্য বাড়তি সম্ভাবনা দেখতে পাওয়ায় ঢাকায় একটি আবাসিক দূতাবাস খোলার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের প্রশংসা করে বলেন, তিনি কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করছেন। অধ্যাপক ইউনূসের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে আজারবাইজানে একটি যুব স্বনির্ভর কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তিনি ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি ড. ইউনূসকে বলেন, ‘আপনার কাজটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবে আমি জানি আপনি এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে অতিক্রম করতে পারবেন।’
প্রেসিডেন্ট আলিয়েভ বলেন, আজারবাইজান ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের ডিজিটালাইজেশনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দুদেশের মধ্যে আরও দৃঢ় সম্পর্কের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে উভয় দেশ সমৃদ্ধ হবে। তেলসমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় আরও বেশি বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকা উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের জাহাজ-নির্মাণ শিল্পে শত শত বাংলাদেশি কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কপ২৯ বৈশি^ক জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে সাইডলাইনে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে আলোচনাকালে ড. ইউনূস ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘শ্রম ইস্যুটি আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অন্যতম এবং আমরা সব শ্রম সমস্যার সমাধান করতে চাই।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রম ইস্যুতে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মানব পাচার ও অভিবাসন ইস্যু নিয়েও আলোচনা করেন।
ড. ইউনূস আইনি মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে অভিবাসন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি ঝুঁকি ও অনিয়মিত অভিবাসন কমিয়ে দেবে এবং মানব পাচারের বিরুদ্ধে বাধা হিসেবে কাজ করবে। ড. ইউনূস জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় বাংলাদেশি তরুণদের আঁকা গ্রাফিতি ও ম্যুরালবিষয়ক বই আর্ট অব ট্রায়াম্ফের একটি অনুলিপি থেরেসা মে’কে উপহার দেন।
এরপর গতকাল দুপুরে ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরালদো আলকমিনের স্ত্রী লু আলকমিন কপ২৯ জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তারা দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
ব্রাজিলের সেকেন্ড লেডি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসকে নিয়ে রচিত তার লেখা একটি বই প্রধান উপদেষ্টাকে উপহার দেন। তিনি জানান, ড. ইউনূসের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তার বইগুলো অনুবাদ করেছেন এবং সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ চালু করেছেন। ড. ইউনূস বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের মধ্যে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বৈঠকগুলোয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, এসডিজিবিষয়ক সিনিয়র সচিব ও মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, তুরস্ক এবং আজারবাইজানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আনামুল হক উপস্থিত ছিলেন।
কপ২৯ সম্মেলনের এক সাইড ইভেন্ট থেকে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে জাস্ট ট্রানজিশনে অর্থায়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আয়োজিত ‘অ্যাকসিলারেটিং ফাইন্যান্স ফর জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ : ইনসাইট ফ্রম কপ২৯’ শীর্ষক অনুষ্ঠান থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠান থেকে আরও জানানো হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানের (এনএপি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৩-৫০ সালের মধ্যে পরিবর্তনের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন মানুষের জন্য জলবায়ুসহিষ্ণু কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে। ওশি ফাউন্ডেশন, ইয়ুথনেট গ্লোবাল এবং ফ্রেডরিখ-ইবার্ট স্টিফটুং (এফইএস), বাংলাদেশ নামে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ওশি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুর রশিদ চৌধুরী রিপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। ওশি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন ড. এসএম মোর্শেদ অনুষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত তার উপস্থাপনা তুলে ধরেন। উপস্থাপনায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সবুজ রপ্তানি কর্মসূচি এবং কৌশলগত রপ্তানি শিল্পের জন্য শতভাগ লিড সার্টিফিকেশন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও জানান, শুধু শ্রমের জাস্ট ট্রানজিশন এবং ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ১১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এই সময়সীমার মধ্যে সব পরিকল্পিত কার্যক্রমের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আবশ্যক।
বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের চতুর্থ দিন গতকালও সম্মেলনের প্রবেশমুখে ন্যায্য অর্থায়নের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন পরিবেশবাদীরা। অন্যদিকে কপ২৯-এর সিইও এলনুর সোলতানভ বিশ্বের বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় যে অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তাকে স্বাগত জানিয়ে আরও অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘চীন বাদে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়নে আনুমানিক ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন প্রয়োজন, যার ১ ট্রিলিয়ন বাহ্যিক উৎস থেকে আসে। কিন্তু যদি আমরা এটাকে এক মুহূর্তের জন্য একপাশে রাখি, তাহলে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখা। যদি আমরা বিশ্বকে এটার দিকে ধাবিত করতে চাই, তাহলে অর্থায়নকে আরও কার্যকর করতে হবে।’
এবারের জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়েছে প্রায় ২০০ দেশের ১৫০ রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান, প্রায় এক হাজার মন্ত্রী আর ৮০ হাজারের মতো সরকারি-বেসরকারি পরিবেশকর্মী। তবে এবারের আয়োজনে প্রতিনিধি পাঠালেও অংশ নেননি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, কানাডা ও ভারতের মতো পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা।