কাঠের ফ্রেমে বন্দি ছোট্ট একটি শিশু। গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি। মুখে রাজ্যের হাসি। চুলগুলো চিকচিকে কালো। চোখজোড়া মায়াবি। ফুটফুটে সুন্দর, যেন দেবশিশু। পাঁচ বছর বয়সী এই কন্যা শিশুটির নাম আলিনা ইসলাম আয়াত। মা সাহেদা আকতার তামান্না, বাবা সোহেল রানার কাছে নাঁড়ি ছেঁড়া ধনের এই ছবিটি এখন সম্বল, অমূল্য স্মৃতি।
আজ শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) এই শিশুকন্যার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২২ সালের এই দিনেই মুক্তিপণ না পেয়ে ফুটফুটে আয়াতকে হত্যা করে পাষণ্ড আবির আলী (২০)। খুন করে ক্ষান্ত হয়নি সে। লাশ কেটে ছয় টুকরো করে ভাসিয়ে দেয় সাগরে। সমুদ্র সৈকত থেকেই আয়াতের মরদেহের খন্ড খন্ড অংশ উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সেদিন বিকেলে নগরের বন্দরটিলা নয়ারহাট এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিল আয়াত। ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছিল তাকে। এ ঘটনায় নগরের ইপিজেড থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়। কিন্তু কিনারা হয়নি। পরে পিবিআই’র কাছে যান আয়াতের বাবা সোহেল রানা। এরপর ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
গ্রেপ্তারের পর ‘খুনি’ আবীর পিবিআই কর্মকতার্দের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, হঠাৎ বড় লোক হওয়ার স্বপ্ন থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণ করে সে। পরে মুক্তিপণ না পেয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর ছয় টুকরো লাশ ভাসিয়ে দেয় নগরের পতেঙ্গা এলাকায় সাগরে। ভারতীয় চ্যানেলের ধারাবাহিক ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখেই আয়াতকে খুনের পর ছয় টুকরো করে বলে পিবিআইকে জানায় সে।
এ ঘটনায় আবিরের বাবা ও মাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর চারদিন পর গ্রেপ্তার করা হয় আরও এক কিশোরকে। ওই কিশোর আয়াত হত্যায় আবিরকে সহযোগিতা করেছিলো। তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্টোর তৎকালীন পরিদর্শক মনোজ কুমার দে।
অভিযোগপত্রে আবির আলীকে আসামি করে তার বাবা-মা ও কিশোরী বোনকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন। আবিরের সহযোগী কিশোরকে ‘দোষী’ করে আলাদাভাবে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকতার্।
বর্তমানে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি চট্টগ্রাম মহানগর ষষ্ঠ অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলায় মোট ৫০ জন সাক্ষীর মধ্যে গতকাল বুধবার (১৩ নভেম্বর) পর্যন্ত বাদীসহ চারজন সাক্ষীর সাক্ষগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার বাদী আয়াতের বাবা সোহেল রানার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। প্রধান আসামি আবির আলী কারাগারে থাকলেও বর্তমানে জামিনে রয়েছে তার সহযোগী ওই কিশোর।
আদালত সুত্র জানায়, আগামী ২৮ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধায্যর্ করেছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোবাইলে কথা হলে আয়াতের বাবা সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মা মণির জন্য প্রতিদিন আল্লাহর কাছে মেয়ের জন্য জান্নাত চাই। খুনি আবিরের ধ্বংস চাই। আমার কলিজাকে কেটে সে ছয় টুকরো করেছে। এখন ফ্রেমে বাঁধা আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে হাসিমাখা ছবি দেখেই মনকে শান্তনা দিই।’
আয়াতের মা সাহেদা আক্তার তামান্না বলেন, ‘মেয়ের মুখটাও দেখতে পেলাম না। পাষণ্ড আবির আলী আমার পৃথিবী কেড়ে নিয়েছে। আমি তারা ফাঁসি চাই। তাকে যারা সহযোগিতা করেছে তারা জামিনে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার আয়াতের কথা মনে পড়লে তার ছবি বুকে নিয়ে মনকে শান্তনা দিই। কেঁদে বুক ভাসায়।’
পুলিশ জানায়, ২০ লাখ মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণ করেছিল তাদের ভবনেরই ভাড়াটিয়া আবির আলী। মুক্তিপণ পাবে না এমনটা নিশ্চিত জানার পর আলিনা ইসলাম আয়াতকে শ্বাসরোধে হত্যা করে সে। মরদেহ গুম করতে ৬ টুকরো করে প্যাকেটে মুড়িয়ে পতেঙ্গা এলাকায় সাগর ও খালের ২টি জায়গায় ফেলে দেয় সে। পরে আবিরকে নিয়েই কিছু খন্ডিতাংশ উদ্ধার করে পিবিআই।
শুরুর দিকে মামলাটি পরিচালনা করেছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোজাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আয়াত হত্যা একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। গুরুত্বপূর্ণ যে সাক্ষীরা রয়েছেন তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে মামলা তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হবে।’
