জমিতে ছত্রাকনাশক কীটনাশক ছিটিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর দুর্গাপুরের ফুলকপি চাষিরা। উপজেলার গগনবাড়িয়া এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষকের জমির ফুলকপি কীটনাশক ছিটানোর পর পরই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন চাষিরা। ঋণগ্রস্ত কৃষকরা এখন কীভাবে কিস্তি শোধ করবেন—তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
জানা গেছে, এই এলাকায় একবার জমি লিজ নিয়ে তিন ফসল করে থাকেন কৃষকরা। এবার ১৫ বিঘায় ফুলকপির আবাদ করেন তারা। প্রতি বিঘা লিজ বাবদ খরচ হয় ৭০ হাজার টাকা।
গগনবাড়িয়া এলাকার কৃষক শফিকুল ইসলাম প্রায় ১৮ বছর ধরে কৃষি কাজ করেন। দুই এনজিও থেকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। প্রথমে সবজি ও করলা থেকে লাভ করেছিলেন দেড় লাখ টাকা। তবে দ্বিতীয় ফসল ফুলকপিতে ডুবে গেছেন তিনি। শফিকুল জানান, এবারই প্রথম এরকম ক্ষতির শিকার হলেন তিনি। ঋণের টাকায় তিন বিঘা জমি টেন্ডার নিয়ে সবজি চাষ করেন। করলা চাষে বিঘাপ্রতি তার খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় এক লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। সেখান থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ করেন তিনি। এর চেয়েও বড় আয়ের উৎস ছিল ফুলকপি। এতে বিঘাপ্রতি দুই লাখ টাকা করে লাভ হয়ে থাকে। এক বিঘা ৭ হাজারের বেশি চারা থাকে। প্রতিটি ফুলকপি ৪০ টাকা করে হলেও প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয় এক বিঘায়।
শফিকুলের মত ওই এলাকার কৃষক হযরত আলী, সেকেন্দার, মুন্টু, আজিবর, কামরুল, রবিউল, ছানারুল, আতাউর, শহিদুল, হাসানসহ আরো কয়েকজন এবারে ফুলকপি চাষ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষকরা দাবি করেন, নিউজিম ছত্রাকনাশকের কারণে ফুলকপি নষ্ট হয়েছে। তারা ক্ষতিপূরণের দাবি জানালে কোম্পানির লোকেরা বিঘাপ্রতি ৮০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছিল। কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে বিষয়টি মিটমাট হয়। কিন্তু ওই কোম্পানির লোকজন ফোন না ধরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরমাঝে তারা বাজার থেকে ওই লটের বিষ সরিয়ে ফেলেছে। ডিলার আর বিষ কোম্পানির লোক তাদের ক্ষতি করেছে।
তারা বলেন, বিষয়টি কৃষি অফিসারকে জানানো হয়েছে। তিনি মাঠে এসে মাটি, ফসল ও বিষ চেক করে বলেছেন, এটা বিষের জন্যই হয়েছে। পরে টাকা দিয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। কৃষকরা জানান, ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
হযরত আলী নামের কৃষক বলেন, ‘বাড়িত থাকতে পারছি না। সংস্থার লোকজন এসে তাড়াচ্ছে। আর কোনো আবাদ করতে পারব না।’
সেকেন্দার নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘এখানে আমরা অন্তত ১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সবাই কিস্তিতে টাকা নিয়ে ফসল করেছিলাম। আমি আড়াই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দুই বিঘা জমিতে ফসল করি। সব ক্ষতি হয়ে গেলো।’
কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ৭ লাখ টাকা লাভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফুলকপি তোলার কয়েকদিন আগে পঁচন ধরে সব নষ্ট হয়ে গেছে। ব্লেসিং এগ্রোভেট কোম্পানির ছত্রাকনাশক কীটনাশক নিউজিম দিই। এই কীটনাশকে কপাল পুড়লো আমাদের। এলাকার সব কৃষকের ফুলকপি নষ্ট হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে ব্লেসিং এগ্রোভেট কোম্পানির এসইও মোস্তফিজুর রহমান বলেন, ‘কোয়ালিটিতে আমার পণ্যে কোনো সমস্যা নাই।’ ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় কীটনাশক ডিলার ছাতাহার আলী বলেন, ‘আমি অনেক আগে থেকে দোকান করি। আগেও এই কীটনাশক বিক্রি করেছি। এবারই প্রথম এরকম হয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত নাই। বিষয়টি কোম্পানিকে জানিয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাদের কোনো যোগাযোগ নাই।’
এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন বলেন, ‘জমিতে আবারও স্প্রে করা হয়েছে। রিপোর্ট কেমন আসে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, ‘স্যাম্পল কালেকশন করে পাঠানো হয়েছে। চেষ্টা করছি কৃষকদের পাশে থাকার। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দেখার জন্য কোম্পানির লোককে বলেছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর উপ-পরিচালক উম্মে ছালমা বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’