বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র (রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ও আইপিপি) থেকে গত ১৫ বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। যার মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্র ভাড়া) দিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়া বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ‘দায়মুক্তি’ আইনে করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বিশেষ বিধানের আওতায়।
দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে বিশেষ আইনের আওতায় করা চুক্তিতে বহুল আলোচিত-সমালোচিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র ১ বছর ৩ মাসে আমদানি করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহের দোহাই দিয়ে মূলত বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে অনৈতিক ব্যবসায়িক সুবিধা দিতেই আওয়ামী লীগ সরকার এ আইনটি করেছিল দেড় দশক আগে। এতে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপ হয়েছে। ভোক্তার কাঁধে বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যয় চেপেছে বহুগুণ। আর এ খাতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশেষ ওই বিধান স্থগিত করার পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে এই আইনের আওতায় প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলোর কাজও স্থগিত করা হয়েছে। আর গতকাল আইনটির ৬(২) ধারায় ক্রয়সংক্রান্ত এবং ৯ ধারায় দায়মুক্তির বিধানকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে উচ্চ আদালত।
বিশেষ আইনে প্রতিযোগিতা বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ পেয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা এবং তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে সামিট গ্রুপ। অস্বচ্ছতার পাশাপাশি এসব চুক্তির ক্ষেত্রে অতি গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। প্রতিযোগিতা না থাকায় বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছে। ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে যে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে, সেটিও বিশেষ আইনে। আদানির সঙ্গে অসম চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে।
প্রতিযোগিতা ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুযোগ দেওয়ায় গত ১৫ বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে হয়েছে অন্তত পাঁচগুণ। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ১৪ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৩ বার।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হলে বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হতো বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ এবং এ খাতের কর্মকর্তারা।
প্রতিযোগিতা ছাড়া বিশেষ আইনে বিদ্যুৎ কেনার ফলে কী পরিমাণ অর্থের তছরুপ হয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে যে ধারণা পাওয়া গেছে, তাতে এর পরিমাণ ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আইনটি করার আগে দেশে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট ছিল। সেই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির জন্যই ওই আইনটি দেশের স্বার্থে করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতির দেশ থেকে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
তবে ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো যুক্তিতেই এ আইন কখনই বৈধ নয়। এ আইনের মাধ্যমে ভোক্তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে বিগত সরকার। বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে ব্যাপক অর্থের তছরুপ করা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগকারীকে নানাভাবে লাভবান করার একটি অন্যতম কৌশল এটি।’
তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই এ আইনের বিরোধিতা করা হলেও বিগত সরকার কোনো যুক্তি, বিরোধিতা আমলে নেয়নি। আদালত এখন আইনের দুটি ধারা বাতিল করেছে। আমরা মনে করি দেশের স্বার্থে এখনই অবৈধ এ আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।’
শামসুল আলম বলেন, বেসরকারি খাতের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের দাম এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রথম তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের বিনিয়োগ ব্যয় উঠে গেছে। পরে এ মেয়াদ বৃদ্ধি করে টাকা দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন অনুযায়ী একটা লুণ্ঠন ব্যয়। বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই ভোক্তাবান্ধব করার জন্য পিডিবিকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন তিনি।
তীব্র বিদ্যুৎ-সংকট মোকাবিলার কথা বলে ২০১০ সালে দুই বছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান)’ নামে একটি আইন করেছিল সরকার। এ আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ, জ্বালানি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি দায়মুক্তি আইন হিসেবেও পরিচিত পেয়েছে। তিন দফা মেয়াদ বৃদ্ধি ও সংশোধনের পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত এর কার্যকারিতা রয়েছে। দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বাড়ার পরও আইনটি বহাল রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে : ২০১০ সালে আইনটি পাসের সময়ই সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে যখনই এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তখনই আপত্তি উঠেছে। কিন্তু কোনো আপত্তি, বিরোধিতায় এ আইন বাতিল হয়নি।
দায়মুক্তি আইনটি করার পর বিগত সরকার ২০১০ সালে বলেছিল, ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ বিদ্যুতের দাম আর না বাড়িয়ে বরং কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ৩ টাকা ৩ পয়সা। পরের অর্থবছরে তা ৩ টাকা ১০ পয়সা হয়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয় ৭ টাকা ৬৩ পয়সা। এ ব্যয় অস্বাভাবিকহারে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ টাকা ২১ পয়সা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আভাস মিলেছে।
বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় প্রতি বছরই বেড়েছে। এর মধ্যে গত বছর তিন দফায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত মেনে ভর্তুকি পুরোপুরি সমন্বয়ক করলে বিদ্যুতের দাম ৭৮ শতাংশ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পিডিবি।bfu
জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল না: ডা. শফিকুর রহমান
শাপলা চত্বর জঞ্জালমুক্ত হয়েছে বলিনি আমি: ফারুকী
কমেছে মাছের দাম, আলু-পেঁয়াজ চড়া
আওয়ামী লীগের সামনের পরিকল্পনা কী?
লড়াইয়ের পথে কি ‘২৪-এর প্রজন্ম একা, প্রশ্ন উপদেষ্টা আসিফের