এবার শিরোপা জিতে অপূর্ণতা ঘোচাতে চাই

নারায়ণগঞ্জের ছেলে অমিত হাসান জাতীয় লিগে খেলছেন সিলেট বিভাগের হয়ে। এনসিএলে এই মৌসুমের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান অমিত কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের রাফিদ চৌধুরীর সঙ্গে

ক্রিকেটে আপনার শুরুটা কবে থেকে?

অমিত হাসান : সময়টা ২০১৪ সাল। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। আমার বড় ভাই ক্রিকেট খেলতেন। তাকে দেখেই আগ্রহটা জন্মায়। একদিন তিনি আমাকে পুরান ঢাকার মাহি ভাই নামে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা মসজিদের পাশে একটা মাঠ ছিল, সেখানে ১০-১৫ জন নিয়ে অনুশীলন করাতেন। আমার শুরুটা সেখান থেকেই। তারপর অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ঢাকা মেট্রোর হয়ে খেলার সুযোগ পাই। তারপর অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আসি। ১৮ বছর বয়সেই আমার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়।

নারায়ণগঞ্জের ছেলে হয়ে সিলেটে গেলেন কীভাবে?

অমিত : ঘটনাটা ২০১৯ সালের। তখন আমি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলছিলাম। সিলেটের তখন একজন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন ছিল। তখন নির্বাচক ছিলেন হান্নান সরকার স্যার। তিনি আমাকে সিলেট দলে তখন দিয়েছিলেন। সে বছরই আমার অভিষেক হয়, এখনো আমি সিলেটের হয়েই খেলছি। পাঁচ বছর তাদের সঙ্গে থাকায় সিলেটি ভাষাটাও আমি প্রায় শিখে ফেলেছি। ঠিকমতো বলতে না পারলেও ভাষাটা আমি পুরোপুরি বুঝি। ওখানকার কেউ শুদ্ধ না বললেও আমার এখন কথা বলতে সমস্যা হয় না। আর দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে থাকায় বন্ডিংটাও হয়েছে দুর্দান্ত। আমার মনেই হয় না আমি সিলেটের স্থানীয় না। তারা আমাকে এতটাই আপন করে নিয়েছেন।

সিলেট এবার খেলছে আপনার নেতৃত্বে। অধিনায়ক হওয়ার অনুভূতিটা কি এবারই প্রথম?

অমিত : প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এবারই প্রথমবার অধিনায়কত্ব করছি। তবে এটাই প্রথম নয়। বয়সভিত্তিক দলেও অধিনায়কত্ব করেছি। সেটা ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। ঐ বছরে আমার জীবনে অনেক কিছুই স্বপ্নের মতো এসে ধরা দিয়েছিল। মাঝেমাঝে মনে হয় এটা আমার জন্য ‘লাকি ইয়ার’ ছিল।

আগে দুই টায়ারে হতো জাতীয় লিগ। এবার এক টায়ারেই। এতে ক্রিকেটাররা কি উপকৃত হচ্ছেন?

অমিত : অবশ্যই উপকার পাচ্ছি। আগে তো তিনটি দলের বিপক্ষে খেলতাম। সবার সঙ্গেই দুটি করে ম্যাচ থাকত। তাই পরিকল্পনাটা সহজ ছিল। তবে এখন এক টায়ারে আসায় প্রতিযোগিতাটা চ্যালেঞ্জিং হয়েছে। ৭ দলের বিপক্ষেই খেলতে হচ্ছে একটি করে ম্যাচ। প্রতি ম্যাচেই নতুন প্রতিপক্ষ, সব দলের বিপক্ষেই নতুন করে সাজাতে হচ্ছে পরিকল্পনা। এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। তবে ভবিষ্যতে এটা আমাদের কাজে আসবে।

৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আপনি প্রথম শ্রেণিতে দুই ধরনের বলে খেলেছেন। আগে কোকাবুরা, এখন ডিউক। নতুন সংযোজিত এই বল ব্যাটসম্যানদের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং?

অমিত : কোকাবুরা বলটা দ্রুত পুরনো হয়ে যেত। ফলে পিচে মুভমেন্ট থাকত কম। এটা ব্যাটসম্যানদের জন্য শট খেলতে সহজ হতো, রানও নেওয়া যেত অনায়াসে। গতি ও বাউন্স নির্ধারিত থাকায় লাইন বুঝে সহজে খেলা যেত। তাছাড়া স্পিনারদের বলও বেশি টার্ন করত না যা ব্যাটসম্যানদের জন্য সুবিধার ছিল। আমি দুই বছর এ ধরনের বলে খেলেছি। গত তিন বছর ধরে খেলছি ডিউক বলে। এই বল আবার বোলার-ব্যাটসম্যান উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। বল ভালো গ্রিপ করে বলে বাড়তি সিম মুভমেন্ট হয়। যা শট খেলা কঠিন করে তুলে। তাছাড়া নতুন বল সুইং করে বেশি, যা শুরুতে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে খুব। এই ধরনের বলে মাঠে খেললে সব চ্যালেঞ্জ জয় করেই ভালো ইনিংস খেলতে হয়।

কক্সবাজারে ২১৩ রানের ইনিংসটা কি সেসব চ্যালেঞ্জ জয় করেই? ঐ দিন তো সারা দিন কোনো উইকেট হারাননি আপনারা। গালিবের সঙ্গে আপনার ইনিংস বড় করার গল্পটা যদি একটু বলতেন?

অমিত : আসলেই আমরা চ্যালেঞ্জ জয় করেছি। কক্সবাজারের উইকেট ছিল সেদিন বোলারদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেটা বুঝতে পেরেই আমরা দুজন পরিকল্পনা করি সেশন ধরে ধরে খেলার। প্রতিটা সেশন ২ ঘণ্টা, আমরা ঐ সময়টায় কোনো উইকেট হারাতে চাইনি। পরিকল্পনা মতো আমরা এগিয়ে যেতে পেরেছি। ফলে দুজনেই বড় একটা ইনিংস খেলতে পেরেছিলাম। আমি ডাবল সেঞ্চুরি পেয়েছি। গালিব পেয়েছে সেঞ্চুরি। শেষবেলায় গিয়ে আমরা উইকেট হারিয়েছি। তবে ততক্ষণে আমরা ভালো একটা সংগ্রহ দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলাম।

আপনার ঐ ইনিংসের পর নির্বাচক হান্নান সরকার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেনÑ ‘আপনি জাতীয় দলের দ্বারপ্রান্তে।’ এসব মন্তব্য আপনাকে কতটা আরও ভালো করার তাগিদ দেয়?

অমিত : হান্নান স্যার বলেছেন! স্যার তো আমার বয়সভিত্তিক দল থেকেই চেনেন। সুতরাং উনার কাছ থেকে পাওয়া যেকোনো প্রশংসাই আমার জন্য বড় প্রাপ্তির। এটা শোনার পর তো আরও ভালো খেলার তাগিদ অনুভব করছি। তবে আমার কাজই তো রান করা। আমি শুধু জানি, ভালো খেললে বড় ইনিংস গড়লে জাতীয় দলে সুযোগ আসবেই। আমরা প্রত্যেক ক্রিকেটার পরিশ্রম করি, সবার চোখেই স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা।

ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আপনি ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করছেন। পাশাপাশি আপনি এইচপি দলেরও নিয়মিত সদস্য। কিন্তু এনসিএল বা বিসিএলে যে পারফরম্যান্স দেখা যায়, সেটা এইচপি বা এ দলের হয়ে করতে পারেন না দেশের বেশিরভাগ তরুণ ক্রিকেটার। এটা কেন হয়ে থাকে বলে আপনি মনে করেন?

অমিত : এখানে বেশ কিছু বিষয় জড়িত। যার মধ্যে অন্যতম কন্ডিশন। বাইরের কন্ডিশনে মানিয়ে নিতে অনেকের একটু সময় লাগে। তাছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের বোলারদের অ্যাকুরেসি আর প্রতিপক্ষ এ দলের অ্যাকুরেসির মধ্যেও অনেক পার্থক্য। আর উইকেটের পার্থক্য তো আছেই। যেমন আমরা এখানে যে ধরনের উইকেটে খেলি, অস্ট্রেলিয়ায় খেলা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের উইকেটে। এসব কারণে আসলে শুরুতেই ব্যাটসম্যানরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারেন না। তবে মাত্র তো শুরু হলো, ধীরে ধীরে আমরা এ দল বা এইচপি দলের ক্রিকেটাররাও বাইরের কন্ডিশনে বড় ইনিংস খেলতে পারব।

অনেকের মতে, বাংলাদেশের যত কোয়ালিটিফুল বোলার আছেন তারা সবাই খেলেন সিলেটে। তারা আপনার সতীর্থ হওয়াতে আপনি ঐ চ্যালেঞ্জটা বুঝতে পারছেন না। আসলেই কি তাই?

অমিত : আমি মনে করি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যারা খেলেন, তারা সবাই কোয়ালিটিফুল বোলার। এখন সবাই যদি বলেন যে শুধুই সিলেটের বোলাররাই কোয়ালিটিফুল আমি দ্বিমত করব না। কারণ এটাও আমার জন্য সৌভাগ্যের। কারণ অনুশীলনের সময় নেটে তাদের বল মোকাবিলা করেই আমাকে প্রস্তুত হতে হয়। অনুশীলনে তাদের খেলি বলেই হয়তো বাকি বোলারদের কঠিন বলের চ্যালেঞ্জ নেওয়াটা সহজ হয়ে যায়।

কার খেলা বেশি ভালো লাগে?

অমিত : আমার ভালো লাগে মুশফিক ভাইয়ের খেলা। তাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করি। কারণ তিনিও উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান, আমিও একই রোলে খেলি।

কাল (আজ) তো আরেকটি ম্যাচ। নিজেকে আর দলকে নিয়ে কী ভাবনা? এবার কি চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন?

অমিত : আমার প্রধান কাজ ব্যাট হাতে ভালো একটা ইনিংস খেলা। আর যেভাবে খেলেছি শেষ ম্যাচে, সেটার ধারাবাহিকতা রাখা। আমি রান করলে উপকৃত হবে দল। পয়েন্ট তালিকায় এখনো আমরা শীর্ষে আছি। সেটা ধরে রাখতে চাই। সেটা পারলেই আমরা এবার চ্যাম্পিয়ন হব। ২০১৯ সালে আমরা টায়ার-২ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। তবে টায়ার-১ এ গত বছর শীর্ষে

থেকেও শেষ পর্যন্ত হয়েছি রানার্স-আপ। তাই এবার সেই অপূর্ণতা ঘোচাতে চাই।