ভুটানি রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই পাপন সিংকে কাঁধে তুলে নিলেন রাকিব হোসেন। একটু পর তাকে ঘিরে মাঠের মাঝখানে হলো ছোটখাটো একটা উদযাপন। তাতে যোগ দিলেন স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরাও। এরপর চলল বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার গ্যালারি ভরিয়ে তোলা সমর্থকদের কৃতজ্ঞতা জানানোর পর্ব। এভাবেই বছরটা বাংলাদেশ শেষ করল অসাধারণ এক জয়ে। শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখলেন বাংলাদেশের তরুণরা। মজিবর রহমান জনির সমতাসূচক গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে সুপার সাব পাপনের গোলে ধরা দিল বহু প্রতীক্ষিত জয়। তাতে বসুন্ধরা গ্রুপ ফিফা টায়ার-১ আন্তর্জাতিক সিরিজটা শেষ হলো সমতায়।
অথচ আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও মালদ্বীপ পেয়ে গিয়েছিল সুযোগ সন্ধানী লিড। ২৩ মিনিটে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণের অমার্জনীয় ভুলের বড় খেসারত দিতে হয় দলকে। প্রথম ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও মালদ্বীপের হয়ে পোস্টের দেখা পান অভিজ্ঞ আলি ফাসির। তবে আগের ম্যাচে যেটা হয়নি, এই ম্যাচে হয়েছে জনি-পাপনদের জাদুতে। প্রথম ম্যাচে গোল ছাড়া সবকিছুই করেছিল বাংলাদেশ। এই ম্যাচেও হয়েছে তাই। মুহুর্মুহু আক্রমণে বারবার মালদ্বীপ রক্ষণে হামলে পড়েছে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা। পরীক্ষিত রাকিব, শেখ মোরসালিন ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের সঙ্গে সৈয়দ শাহ কাজেম কিরমানির জায়গায় মাঠে নামা মজিবর রহমান জনি খেলেছেন ছকে বাঁধা ফুটবল।
বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা বারবার গোলের চেষ্টা করে গেছে। তবে ম্যাচে প্রথম গোলটা পেয়েছে মালদ্বীপ। সেটাও দলের রক্ষণের সবচেয়ে বিশ্বস্ত তপুর মহাভুলে। ২৩ মিনিটে এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার বল পেয়ে ক্লিয়ার করার যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন। তবে তিনি সতীর্থদের না দিয়ে বল পায়ে তুলে দেন ইব্রাহিম মাহুধির পায়ে। ত্বরিত এই ফরোয়ার্ড বক্সে বল পাস দেন আলি ফাসিরকে। ঠা-া মাথায় ডান পায়ের প্লেসিংয়ে মিতুল মারমাকে পরাস্ত করেন আগের ম্যাচের জয়ের নায়ক। পিছিয়ে পড়লেও আশা ছাড়েনি বাংলাদেশ। পাসিং ফুটবলে প্রথম বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা আক্রমণে গেছে। বেশিরভাগ আক্রমণেরই রচয়িতা ছিলেন রাকিব। ডান দিক দিয়ে সবসময় ভীতি ধরিয়ে গেছেন এই দ্রুতগতির উইঙ্গার। প্রথম ম্যাচে ক্রসগুলো ঠিকঠাক হচ্ছিল না। তবে এই ম্যাচে হয়েছে। ৪০ মিনিটে বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে রাকিব অসাধারণ কাটব্যাক দিয়েছিলেন। চলন্ত বলে ফাহিমের ডান পায়ের অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন মালদ্বীপ কিপার হুসেইন শরিফ। ফিরতি বলে মোরসালিনের এলোমেলো শট বাইরে যায়। এর তিন মিনিট পর মজিবর রহমান জনির দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফিরে বাংলাদেশ। মালদ্বীপের বক্সে মোরসালিনের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে জনি বডি ডজে দুই ডিফেন্ডারকে বিভ্রান্ত করে ডান পায়ের কোনাকুনি শট নেন, যা মালদ্বীপ কিপারকে কোনো সুযোগ না দিয়ে জালে জড়ায়। গত বছর সাফের আগে কম্বোডিয়াকে হারানোর ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলের খাতা খুলেছিলেন এই মিডফিল্ডার। ঘরের মাঠে পেলেন দ্বিতীয় গোল।
বিরতি থেকে বাংলাদেশ ফেরে একটা পরিবর্তন নিয়ে। লেফটব্যাক ইশা ফয়সালের জায়গায় আসেন রহমত মিয়া। ম্যাচের ৫০ মিনিটে তার লম্বা বল মালদ্বীপের এক ডিফেন্ডার রাকিবের পায়ে তুলে দিয়েছিলেন। বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নেন পুরো ম্যাচে সপ্রতিভ রাকিব। তবে মালদ্বীপ কিপার ফিস্ট করে দলকে সে যাত্রায় রক্ষা করেন। তিন মিনিট পর অবশ্য ভালো সুযোগ ছিল মালদ্বীপের। ডান দিক থেকে নাইজ হাসানের ক্রসে আহমেদ রিজুভানের হেড দারুণ ক্ষিপ্রতায় রুখে দেন মিতুল মারমা। ম্যাচ যতই গড়িয়েছে কাবরেরা ক্লান্তদের তুলে নিয়ে ফ্রেশলেগদের নামাতে থাকেন। তাতে আক্রমণের গতি আরও বাড়ে। বিশেষ করে শাহরিয়ার ইমন, চন্দন রায়, পিয়াস আহমেদ নোভা ও পাপন সিংয়ের আগমনে শেষ সময় শুরু হয় আক্রমণের সুনামি। ৮৪ মিনিটে অভিষেকটা রাঙানোর সুযোগ হাতছাড়া করেন নোভা। ইমনের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট গ্লাভস ফসকে গিয়েছিল মালদ্বীপ কিপারের। নোভা ভালো জায়গায় বল পেয়েও পোস্টে বল রাখার আনুষ্ঠানিকতা সারতে পারেননি। তার দুর্বল শট অবিশ্বাস্যভাবে চলে যায় বাইরে।
নোভা না পারলেও নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে এই ম্যাচের অধিনায়ক সোহেল রানার জায়গায় মাঠে নেমে ঠিকই পাপন সিং বনে যান জয়ের নায়ক। যোগ করা সময়ে এই সুপার সাবের গোলেই ধরা দেয় কাক্সিক্ষত জয়। বদলি পাপন গোল করেছেন আরেক বদলি শাহরিয়ার ইমনের অসাধারণ ফুটওয়ার্কে। বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে মার্কারকে বোকা বানিয়ে দারুণ সেট-আপ দিয়েছিলেন ইমন। বদলি স্ট্রাইকার নোভা ডামি করলে গোলমুখে চলে যায় বল। তাতে পাপন সিংয়ের প্লেসিং রুখতে পারেননি মালদ্বীপ কিপার হুসেইন শরিফ।
বছরে এটি ছিল বাংলাদেশের অষ্টম ম্যাচ। আগের সাত ম্যাচের ছয়টিতে হার, এক জয়, একটি মাত্র গোলে বড্ড মলিন লাগছিল বাংলাদেশ শিবিরকে। শেষ ম্যাচটা তারা জিতে কুড়িয়ে নিয়েছে আগামীতে ভালো খেলার আত্মবিশ্বাস। যেটা পৌঁছে গিয়েছিল একেবারের তলানিতে।