ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে ব্যাপকহারে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। গতকাল রবিবারের এ হামলা প্রায় তিন মাসের মধ্যে দেশটিতে চালানো বৃহত্তম হামলা বলে অভিহিত করেছে কিয়েভ। হামলায় রাশিয়া ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৯০টি ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হামলায় বিদ্যুৎব্যবস্থা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করেছে মস্কো। বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে রাশিয়ার হামলার কারণে চলতি শীতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউক্রেনীয় কর্র্তৃপক্ষ। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর এ ব্যাপকমাত্রার হামলা চালাল রাশিয়া। নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার ট্রাম্প এই যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে কীভাবে তিনি সেটি করবেন, তা স্পষ্ট করেননি। এমনকি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ সমাপ্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মধ্যে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে বলে শঙ্কা বিশ্লেষকদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (টুইটার) ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা লিখেছেন, রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় বিমান হামলা শুরু করেছে। শান্তিপূর্ণ শহর, ঘুমন্ত বেসামরিক, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করছে দেশটি। ইউক্রেনের বৃহত্তম বেসরকারি জ্বালানি সরবরাহকারী ডিটিইকের সিইও ম্যাক্সিম টিমচেনকো বলেছেন, ডিটিইকে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ইউক্রেনের শক্তি ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এ আক্রমণগুলো আবারও আমাদের মিত্রদের কাছ থেকে ইউক্রেনের অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের ভলিন, রিভনে, লভিভ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক ও জাপোরিঝিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জ্বালানি কর্মকর্তাদের নির্দেশে দক্ষিণ ওদেসা অঞ্চলে জরুরি বিদ্যুৎবিভ্রাট আরোপ করেছে কর্র্তৃপক্ষ। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের সব অঞ্চলকে লক্ষ্য করে ব্যাপক সম্মিলিত হামলা চালানো হয়েছে।
কিয়েভের কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশটির দক্ষিণের শহর মাইকোলাইভে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। রেল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে একটি রেল ডিপোতে হামলায় আরও দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী লভিভ অঞ্চলে একটি গাড়িতে থাকা এক নারী নিহত হয়েছেন। ওদেসা অঞ্চলে আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
এদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জি-৭ জোটের নেতারা। এক বিবৃতিতে জি-৭ জোটের নেতারা বলেছেন, ন্যায় ও স্থায়ী শান্তির পথে এখন একমাত্র বাধা রাশিয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছে, তা আবার নিশ্চিত করছে জি-৭। এ যুদ্ধে ইউক্রেনের যতদিন দরকার, ততদিন তাদের সমর্থন দিয়ে যাবে জি-৭ জোট। বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির সাত দেশের জোট জি-৭। জোটের সদস্যরা হলো কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। পালা করে একেক দেশ জোটের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে। এখন জোটটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেলা। আগামী বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন ট্রাম্প। এর আগে আরও বেশি পশ্চিমা অস্ত্র ও তহবিল সংগ্রহ করার মরিয়া চেষ্টা করছে ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ক্ষমতার বাকি দিনগুলোয় কিয়েভের প্রতি সমর্থন আরও জোরালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এদিকে গত শনিবার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আগামী বছর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করার ইচ্ছার কথা জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার দিক থেকে আগামী বছরের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার আগ্রাসী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার সব প্রচেষ্টা করা হবে।