২২ নভেম্বর পৃথিবীর দুই প্রান্তে শুরু হবে দুটো টেস্ট ম্যাচ। পার্থ এবং অ্যান্টিগা, মাঝে ১৮ হাজার কিলোমিটারের ব্যবধান, সময়ের পার্থক্য ২৪ ঘণ্টার। পার্থে অস্ট্রেলিয়া-ভারত টেস্টে খেলা শেষ করে রোহিত শর্মা-প্যাট কামিন্সরা যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকবেন, তখন বিছানায় আড়মোড়া ভাঙবেন মেহেদী হাসান মিরাজ-ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটরা। রাত-দিনের এই পার্থক্যের মতো আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও এই দলগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক। অস্ট্রেলিয়া আর ভারত এই টেবিলের শীর্ষ দুই দল, বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সবচেয়ে নিচের দুই দল। অস্ট্রেলিয়া আর ভারত, দুই দলের চোখ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে। বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এই দুই দলের ফাইনালে খেলার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে বা ভূগোলে যতটা পার্থক্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট দর্শনে পার্থক্যটা বোধহয় এর চেয়েও বেশি। অস্ট্রেলিয়া সবসময়ই টেস্ট ক্রিকেটকে রেখেছে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে। ব্যাগি গ্রিন টুপিটা একজন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের কাছে আজন্ম লালিত স্বপ্ন। ভারত আইপিএলের যুগে এসেও টেস্ট ক্রিকেটকে দিয়েছে প্রাপ্য সম্মান। একঝাঁক ক্রিকেটার উঠে এলেও সেরাদের ভারত বেছে বেছে বাঁচিয়ে রাখছে টেস্টের জন্যই। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সূর্যকুমার, তিলক ভার্মা, সঞ্জু স্যামসনরা গেছেন। কিন্তু বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি খেলার জন্য শুবমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল, ঋষভ পান্তদের ঠিকই আগেভাগে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছে বিসিসিআই। সেখানে ভারতের ‘এ’ দল পৌঁছেছে টেস্ট সিরিজ শুরুর ৩ সপ্তাহ আগে। পার্থে টেস্ট শুরু আগের রুদ্ধদ্বার অনুশীলন করেছে ভারতীয় দল। দেশে নিউজিল্যান্ডের কাছে টেস্ট সিরিজ ৩-০তে হারের পর গৌতম গম্ভীর ও রোহিত শর্মাকে ৬ ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের নামে রীতিমতো জেরা করা হয়েছে। কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে এই অপ্রত্যাশিত হারের, যাতে ভবিষ্যতে এই ভুল আর না হয়।
অস্ট্রেলিয়াও তৈরি হচ্ছে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে সিরিজের জন্য। ২০২২-২৩ মৌসুমে ভারতীয় দল অস্ট্রেলিয়া এসে টেস্ট সিরিজে হারিয়ে গিয়েছিল তাদের, সেই দুঃখ তারা ভারতকে ওয়ানডে বিশ্বকাপে এবং টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে হারিয়েও ভুলতে পারেনি! শুরু হয়ে গেছে কথার লড়াই। টেস্ট সিরিজের জন্য অস্ট্রেলিয়া ট্রাভিস হেড, মিচেল মার্শদের মতো ক্রিকেটারদের বিশ্রামে রেখেছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে। যে সিরিজটা অস্ট্রেলিয়া হেরে গেছে, যেটা ২২ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তানের প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়। এ জন্য সমালোচনা হয়েছে নির্বাচকদেরও।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দুই দলই প্রচ- মাত্রায় টেস্টবিমুখ। দুই দলেরই শীর্ষ খেলোয়াড়রা টেস্ট খেলতে চান না। বাংলাদেশে তো আরও অনেক বায়নাক্কা! অনেকে টেস্ট খেললে আবার নতুন বলে ব্যাট করতে চান না। গায়ে টেস্ট ক্রিকেটার তকমা লেগে গেলে পাছে ঢাকা লিগে বা বিপিএলে দাম কমে যায়, এজন্য অনেকে সামর্থ্যরে বাইরে গিয়েও সাদা বলে খেলতে চান। টেস্ট ম্যাচে দর্শক হয় না। গড়ে ওঠেনি টেস্ট খেলার সংস্কৃতি কারণ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট চূড়ান্ত রকমভাবে অবহেলিত। সামর্থ্যরে অভাবের সঙ্গে আছে মানসিকতারও ঘাটতি। ভারতের বিপক্ষে ভারতের মাটিতে জেতাটা দুরূহ, যদিও বাংলাদেশের চেয়েও কম অভিজ্ঞতা নিয়ে একই দলকে হোয়াইটওয়াশ করার কৃতিত্ব দেখিয়েছে নিউজিল্যান্ড। মিচেল স্যান্টনার আর এজাজ প্যাটেল, দুজনে মিলে খেলেছেন মাত্র ৫০টা টেস্ট, স্যান্টনার ২৯ আর প্যাটেল ২১। অন্যদিকে তাইজুল খেলেছেন ৪৯ টেস্ট, সাকিব ৭১টা। এই অভিজ্ঞতা নিয়েও ভারতে তারা কেবল মারই খেয়েছেন। অন্যদিকে স্যান্টনার-এজাজ মিলে ধসিয়ে দিয়েছেন ভারতের গর্বের ব্যাটিং।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলটার দিকে তাকালে মনে হবে এরা কারা? কেসি কার্টি, জাস্টিন গ্রেভস, মিকাইল লুইস...এদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দল ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। ক্যারিবিয়ানে প্রবল জনপ্রিয় অ্যাথলেটিকস, বাস্কেটবল এবং ফুটবলের পর অবস্থান ক্রিকেটের। সেটাও টি-টোয়েন্টি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের এই যুগে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা খেলে বেড়াচ্ছেন বিশ্বের নানান দেশে। বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট সিরিজ যখন চলবে, একই সময়ে হবে আবুধাবি টি-১০, গায়ানায় হবে গ্লোবাল সুপার লিগ। এমনকি নেপালেও সে সময় চলবে নেপাল প্রিমিয়ার লিগ। ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের অনেকেই পৌঁছে যাবেন হিমালয়ের কোলেও। কিন্তু দেশের হয়ে টেস্ট তারা খেলবেন না। কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের ধারণাটাই এখন মৃতপ্রায়।
এমন দুটো দল টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তলানিতে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। গোটা ক্রিকেট বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির দিকে। সেরা ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে সেরা বোলারদের আগুনে লড়াই। অন্যদিকে বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের লড়াইতে না আছে কোনো আকর্ষণ না আছে বাড়তি কোনো আগ্রহ। এই সিরিজে কারও হারজিত বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না। রাত জেগে বাংলাদেশের খেলা দেখার লোকের সংখ্যাও নিঃসন্দেহে কমবে।
বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ তাই যে শূন্য অঙ্কের সমীকরণ। শূন্য দিয়ে যে সংখ্যাকেই গুণ বা ভাগ করা হোক না কেন, ফল হয় শূন্য। তেমনি ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো না বদলে, খেলোয়াড়দের টেস্ট খেলতে আগ্রহী না করে স্রেফ নিয়মরক্ষার সিরিজ খেললে ফল হবে সেই শূন্য।