স্কুলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন শিক্ষিকা!

বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় গত ৬ মাস অনুপুস্থিত থাকলেও নিয়মিত বেতনভাতা পাচ্ছেন সোনাগাজী উপজেলার চরমজলিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উম্মে হাবিবা। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, ছাত্রছাত্রীদের বেদম প্রহার, শিক্ষক, অভিভাবক ও এসএমসি (স্কুল ম্যানেজিং কমিটি) সদস্যদের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ, ঠিকমতো পাঠদান না করাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয পরিচালনা কমিটি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ছয়বার আবেদন করেছেন অভিভাবক ও এসএমসি সদস্যরা, তিনবার ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের গণস্বাক্ষর নিয়ে উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও স্থায়ী প্রত্যাহারের দাবিতে আবেদন করেন। তবে উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলে জানা গেছে।

গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষক তানভীর আহমেদ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ জুনের পর থেকে উম্মে হাবিবা বিদ্যালয়ে অনুপুস্থিত। ইতিপূর্বে তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও কমিটির সদস্যেদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী ও অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বেদম প্রহার করেছেন। ফলশ্রুতিতে বিদ্যালয় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকরা ওই বিদ্যালয় থেকে উক্ত শিক্ষককে দ্রুত প্রত্যাহার না করলে তাদের ছেলেমেয়েকে ভর্তি করাবেন না ও বিদ্যালয়ে পাঠাবেন না। এমতাবস্থায় উক্ত শিক্ষকের অনিয়মের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন করেন। 

২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর উম্মে হাবিবাকে বক্তার মুন্সী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাময়িক সংযুক্তি প্রদান করা হয়। উক্ত বিদ্যালয়ের অস্বাভাবিক আচরণ, ক্লাস চলাকালীন সময়ে ক্লাসরুমের চেয়ারে বসে মোবাইলে কথোপকথন, শিক্ষার্থীদের মারধর ও বিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমত আসা-যাওয়া করে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আরজু মনোয়ারা তাকে সংশোধনমূলক কথা বললে তার সাথে অসাধারণ আচরণ ও পুলিশ দিয়ে হামলা মামলার হুমকি দেন । গত ৯ মে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশ নিয়ে আসে। এতে করে বিদ্যালয় এলাকার লোকজন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরুপ মনোভাব তৈরী হয়। এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের সরকারি কর্মচারী আচরণ নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হলেও অদৃশ্য কারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
 
সরেজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, গত ১৯ মে থেকে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় উম্মে হাবিবা অনুপুস্থিত রয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীরা তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তারা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া অভিযোগের কপিগুলো এ প্রতিবেদকের হাতে তুলে দেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, তিনি বাড়ি থেকে লাটি নিয়ে এসে ছাত্রছাত্রীদের পেটান। এ ব্যাপারে আমি ও প্রধান শিক্ষক সতর্ক করলে তিনি আমাদেরও পেটাতে উদ্ধত হন। বেশী বাড়াবাড়ি করলে ইভটিজিং ও নারী নির্যাতন মামলা করবেন বলে হুমকি দেন। 

বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুজলা রানী দাস ও কাকলী রানী দাস জানান, আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করানোর জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাই। ম্যাডামের মারধরের কারণে তারা এখন স্কুলে যেতে চায় না। আমরা উক্ত শিক্ষকের প্রত্যাহার চাই। এ ব্যাপারে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ৪৩ জন অভিভাবক উক্ত শিক্ষকের প্রত্যাহারের দাবিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বরাবরে আবেদন করেন। 

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম বলেন, যোগ দেওয়ার প্রথম থেকেই সহকারী শিক্ষিক উম্মে হাবিবা নিয়মিত আসেন না। সপ্তাহে ২/৩ দিন আসতেন। 

জানা গেছে, ২০১৮ সালে ওই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পাশ্ববর্তী মজলিশপুর গ্রামের বাসিন্দা সহকারী শিক্ষক উম্মে হাবিবা। প্রায় ৬ বছর ধরে একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি। (মাঝে ৬মাস ব্যাতিত) তার মূল বেতন ২০ হাজার ৯৪৪ টাকা ( অক্টোবর প্রে স্লিপ থেকে প্রাপ্ত)।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তানভীর আহমেদ বলেন, সহকারী শিক্ষক উম্মে হাবিবার নানা বিষয়ে নানা অভিযোগ আমরা লিখিত আকারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানিয়েছি। তিনি এখন বিদ্যালয়েই আসেন না। বর্তমানে তার অনুপস্থিতিতে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যালয়ে ১৪০ জন ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করছে।  

অভিযুক্ত শিক্ষক উম্মে হাবিবার সাথে যোগাযোগের কয়েকদফা চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ক্ষুদেবার্তা দিলেও তিনি জবাব দেননি। 

এ ব্যাপারে তথ্য জানতে সোনাগাজী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের অফিসে গেলে তিনি আসবেন বলে বসিয়ে রেখে দুই ঘণ্টা পরেও আসেননি। পরে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি তা ধরেননি। মোবাইলে ক্ষুদেবার্তা দিলেও তিনি জবাব দেননি। 

উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, গত নভেম্বর মাস থেকে ওই শিক্ষকের বেতন বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হবে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, এ বিষয়টি আমার জানা নেই। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে জানাননি। আর কোনো শিক্ষক স্কুলে না গিয়ে সরকারি বেতন-ভাতা নিতে পারেন না। খোঁজ নিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।