বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও, বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারেনি কারমাইকেল কলেজ

কারমাইকেল কলেজ বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।  ১৯১৬ সালে কলেজটি রংপুরের ম্যাজিস্ট্রেট কালেক্টর জে.এন. গুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেন  এবং লর্ড ব্যারন কারমাইকেলের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টির লগ্ন থেকেই বৃহত্তর রংপুরের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে । এই কলেজ বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর অধিভুক্ত।  ২০০১ ও ২০০৬ সালে দুটি পৃথক আইন পাশের মাধ্যমে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তবে আইন দুটি এখন কার্যকর হয়নি।

বিগত বিএনপি সরকার সারাদেশের কিছু বড় কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রথমেই ছিল জগন্নাথ কলেজ, এরপরই রংপুরের কারমাইকেল কলেজ। ২০০৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ ও কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। ২০০৬ সালের ১১ অক্টোবর সংসদে কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৬   (৪৫ নং আইন) পাশ হয়ে যায়। এরপর শুধু বাকি ছিল উপাচার্য নিয়োগ। কিন্তু বিএনপির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি বাকি থাকে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভিসি নিয়োগের সম্ভাবতা যাচাই করে। 

 

সার্চ কমিটি গঠন করে পরপর দুইবার সম্ভাব্যতা যাচাই করে। সার্চ কমিটি দুইবারই ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে রংপুরের সুশীল সমাজ ও কারমাইকেল কলেজের কিছু শিক্ষক প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয় না করতে ঢাকায় তৎকালিন তত্ত্ববধায়ক সরকারের সঙ্গে দেখা করে। তীব্র আপত্তির মুখে রংপুরে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্যোগ নেয়। কারমাইকেল কলেজের ৩৫০ একর জমি থেকে ৫০ একর জমি নিয়ে তাতে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করে। 

জগন্নাথ কলেজ ও কারমাইকেল কলেজের পর তালিকায় ছিল- বরিশালের বিএম কলেজ ও সিলেটের এমসি কলেজ, কুমিলার ভিক্টোরিয়া কলেজ, পাবনার অ্যাডওয়ার্ড কলেজ ইত্যাদি। 

রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬ ( ২০০৬ সনের ৪৫ নং আইন ) এখানে ক্লিক করে দেখা যাবে

কারমাইকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তার নামানুসারেই কলেজের নামকরণ করা হয় কারমাইকেল কলেজ। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজে আইএ ও বিএ ক্লাস খোলার অনুমতি দেয়। সেই সময় থেকে প্রায় দুই বছরের জন্য কলেজটির পঠনপাঠনের কাজ চলে রংপুরের বর্তমান জেলা পরিষদ ভবনে। এরপর ১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজের মূল ভবনের উদ্বোধন করা হয়। জার্মান নাগরিক ড. ওয়াটকিন ছিলেন কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ।

এই কলেজ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে রয়েছে অনেক কারণ আর স্বপ্ন। ১৮৩২ সালে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য রংপুর জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে করে রংপুর অঞ্চলের মানুষ লেখাপড়ায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। ওই সময়ে কোনো কলেজ না থাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভারতের কোচবিহারে যেতে হতো। একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠা ছিল রংপুরবাসীর আজন্ম লালিত স্বপ্ন।

১৯১৩ সালে অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড ব্যারন কারমাইকেল রংপুর পরিদর্শনে এলে তার সংবর্ধনা সভায় কলেজ স্থাপনের দাবি উত্থাপিত হয়। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার জমিদার এবং শিক্ষানুরাগীদের দানে সংগৃহীত অর্থ এবং জমিদারদের দান করা ৯০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে কারমাইকেল কলেজ। রংপুর নগরী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এই কলেজের অবস্থান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, সম্মান ও স্নাতকোত্তরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।

অবিভক্ত বাংলার যে কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল এর মধ্যে কারমাইকেল কলেজ রয়েছে প্রথম সারিতে। ইংরেজ আমলের অবিভক্ত বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার প্রসার ও প্রচারের জন্য অসামান্য খ্যাতির অধিকারী এই কারমাইকেল কলেজ। তৎকালীন রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলসহ অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়ি, আসাম ও সংলগ্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। এই কলেজ বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর অধিভুক্ত। ২০০১ ও ২০০৬ সালে দুটি পৃথক আইন পাসের মাধ্যমে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তবে আইন দুটি অদ্যাবধি কার্যকর হয়নি।