ডিজিটাল দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সার্চ ইঞ্জিন। লাখ লাখ ওয়েবসাইট, অসংখ্য কনটেন্ট নির্মাতা এবং বিজ্ঞাপননির্ভর একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি তৈরি হয়েছে এর ভিত্তিতে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত সার্চ ইঞ্জিন সেই অর্থনীতির কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। সম্প্রতি হার্ভার্ডের বার্কম্যান ক্লেইন সেন্টারের গবেষক বেঞ্জামিন ব্রুকস এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার মতে, এআই চালিত সার্চ সিস্টেম ওয়েবের ওপর একটি ভার্চুয়াল প্রাচীর তৈরি করছে, যা কনটেন্ট নির্মাতাদের ভিজিটর সংখ্যা কমিয়ে দেবে। ‘বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতি ভার্চুয়াল ফুট ট্রাফিকের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রিপশন, অনুদান বা পণ্যের বিক্রির আয় সবই দর্শকের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এআই সার্চ সরাসরি উত্তর দিয়ে এই ভিজিটর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে’, ব্যাখ্যা করেন ব্রুকস।
গুগল বা অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনের প্রচলিত মডেলে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের লিঙ্ক তালিকা দেখানোর মাধ্যমে ভিজিটর নিয়ে আসে। কিন্তু নতুন এআই-চালিত সার্চ, যেমন গুগলের সার্চ জেনারেটিভ এক্সপেরিয়েন্স (ঝএঊ), সরাসরি উত্তর প্রদান করে। ফলে ব্লগ নির্ভর কনটেন্ট নির্মাতারা তাদের আয় এবং দর্শকের সংখ্যায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি গবেষণা দেখা গেছে। যেমনÑ সার্চ ইঞ্জিন ল্যান্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই সার্চের কারণে অর্গানিক ট্রাফিক ১৮% থেকে ৬৪% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এ সংকট সমাধানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এগিয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছেন গবেষকরা। বেঞ্জামিন ব্রুকসের মতে, ‘সরকার যখন কঠোর নীতিমালা তৈরি করবে, তা হয়তো প্রযুক্তির গতিকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। তাই এর আগে উদ্যোগ নিতে হবে এআই শিল্পকে।’ তবে এআই কোম্পানিগুলো বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন চুক্তি করছে। এতে ছোট নির্মাতারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ‘এ ধরনের চুক্তি তথ্যের মানকে কমিয়ে দিতে পারে এবং কম খরচের নিম্নমানের তথ্য উৎসকে উৎসাহিত করতে পারে,’ মন্তব্য করেন ব্রুকস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রাকে অনেকেই সম্ভাবনার নতুন দ্বার হিসেবে দেখছেন। কোয়েরিপাল নামে একটি চ্যাটবটের প্রতিষ্ঠাতা দেব নাগের মতে, ‘প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব শুরুর দিকে আশঙ্কা তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। এআই এমন একটি কনটেন্ট বাজার তৈরি করতে পারে, যেখানে মানসম্মত কনটেন্ট আরও সহজে সঠিক দর্শকের কাছে পৌঁছাবে।’
এআই-চালিত নতুন মডেলের কথা উল্লেখ করে নাগ বলেন, ‘কনটেন্ট লাইসেন্সিং এবং ভ্যালু-শেয়ার মডেল হতে পারে এই সংকটের সমাধান। গুগল এবং রেডিটের সাম্প্রতিক চুক্তি এই মডেলের বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।’ এআই প্রযুক্তির গতিপথ থামানো সম্ভব নয়। বরং এটি যেন মানবিক সৃজনশীলতাকে ধ্বংস না করে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রস রুবিন বলেন, ‘এআই সার্চ একদিনের একটি ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে তথ্যপ্রাপ্তির পদ্ধতিকে বদলে দেবে। কিন্তু এই পরিবর্তন যেন কনটেন্ট নির্মাতাদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত না করে, বরং আরও উজ্জ্বল করে তোলে।’ ডিজিটাল অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জ কেবল সময়ের সঙ্গেই সমাধান খুঁজে পাবে। প্রযুক্তি, নীতি এবং সৃজনশীলতার এক মেলবন্ধন তৈরি করলেই হয়তো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে ডিজিটাল দুনিয়া।