আজন্ম অধিনায়ককে শেষ শ্রদ্ধা

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়কত্ব করেই ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই পরিচয়েই জাকারিয়া পিন্টুকে পরিচিত করা যাবে না। তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দলের অধিনায়ক। তবে আমৃত্যু যেই পরিচয়টা দিতেই বেশি ভালোবাসতেন পিন্টু, সেটা হলো তিনি মোহামেডানের পিন্টু। সেই প্রিয় ক্লাবে দেশের ফুটবলের আজন্ম অধিনায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নেমেছিল শুভানুধ্যায়ীদের ঢল। আগের দিন অর্থাৎ সোমবার বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে ৮১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান জাকারিয়া পিন্টু। মঙ্গলবার তাকে নেওয়া হয় মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণে। এরপর তাকে নেওয়া হয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে। দুই জায়গাতেই ফুটবল বীরকে জানানো হয় শেষ শ্রদ্ধা।

খেলা ছাড়ার পর একটা বড় সময় পিন্টুর কেটেছে মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণে। তবে মঙ্গলবার এলেন নিথর দেহে। প্রিয় অধিনায়ককে এক নজর দেখতে সেখানে ভিড় করে ছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার।

রাজা আসবেন। তাই আগেভাগেই মোহামেডান ক্লাবে প্রস্তুত করা হয় ছোট্ট মঞ্চ। জানাজার আগে ঢাকা জেলা প্রশাসনের থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়। এরপর একে একে তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়, বিভিন্ন ক্লাব, ফেডারেশন, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, সাবেক খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন মোহামেডানের অনেক সমর্থক ও স্থায়ী সদস্যরা। ক্লাব মসজিদের ইমাম আওলদ পিন্টুর জানাজা পড়ান।

মোহামেডানকে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন পিন্টু। রক্ষণভাগের দুর্গ তো ছিলেনই, পুরো দলকেই আগলে রাখতেন পরম মমতায়। সেই দলেরই একজন ছিলেন মেজর হাফিজ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এই নেতা পিন্টুর সঙ্গে মোহামেডান ও পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাফিজ বলেন, ‘তিনি মোহামেডানের চীনের প্রাচীর। মোহামেডান ক্লাবের অনেক জয় ও ড্র হয়েছে তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে। তিনি কত বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন সেটা এই সময়ে অনেকের পক্ষে বোঝা খুব দুরূহ হবে। মারকানি (পশ্চিম পাকিস্তানি) খেলোয়াড়দের মধ্যেও সে পাকিস্তান জাতীয় দলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় ছিল। পাকিস্তান দলের চেয়ে মোহামেডানের জার্সিতে খেলা কঠিন ছিল। সেই সময় তিনি ছিলেন টানা আট বারের অধিনায়ক। ফলে খেলোয়াড় হিসেবে তার উচ্চতা কোন পর্যায়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’ ব্যক্তি পিন্টু সম্পর্কে বলতে গিয়ে হাফিজ বলেন, ‘অত্যন্ত শৃঙ্খল এবং নিষ্ঠাবান ব্যক্তি ছিলেন। খুব ধর্মভীরু ছিলেন।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক, স্বাধীনতা পদকজয়ী এএসএম রকিবুল হাসানও মোহামেডানের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। জাকারিয়া পিন্টুকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে রকিবুল হাসান বলেন, ‘ষাটের দশক থেকে পিন্টু ভাইকে দেখছি। তার মতো সুশৃঙ্খল খেলোয়াড় বাংলাদেশে তেমন নেই। বর্তমান সময় তো একেবারেই নেই।’

মোহামেডানের সঙ্গে জাকারিয়া পিন্টুর ছিল নারীর টান। তাই বয়সকে হার মানিয়ে প্রায়ই প্রিয় ক্লাবে চলে আসতেন তিনি। সতীর্থ, অগ্রজ, অনুজদের সঙ্গে আড্ডায় কাটিয়ে দিতেন অনেকটা সময়। সেই স্মৃতিচারণ করেছেন মোহামেডানের সাবেক সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ মোসাদ্দেক আলী ফালু, ‘সমর্থক থেকে আমি ক্লাবের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি অনেক দিন। পিন্টু ভাইয়ের ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা ছিল অন্য পর্যায়ের। বৃদ্ধ বয়সে ক্লাবের সাফল্যে উৎসব করতেন আবার খারাপ ফলাফলে বেদনাক্রান্ত হতেন।’ মোহামেডান ক্লাবের বর্তমান পরিচালক ও ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর পিন্টুর নিবেদন নিয়ে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নিয়েছি বছর তিনেক। এর আগে ক্লাব সংকটময় পরিস্থিতিতে ছিল। সেই সময় বাদল রায়ের সঙ্গে পিন্টু ভাইও বৃদ্ধ বয়সে ক্লাবের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন।’

মোহামেডানের সাবেক হকি তারকা সাজেদ এএ আদেল বলেন, ‘পিন্টু ভাই মোহামেডান হকি দল নিয়েও নানা সময় নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি চাইতেন ষাটের দশকের ফুটবলের মতো সব ডিসিপ্লিনেই মোহামেডান এক নম্বর থাকুক।’

প্রিয় ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে পিন্টুর মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আনা হয় ফুটবল ভবনে। সেখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল। সেখানে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পক্ষ থেকেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ফুটবলের আজন্ম অধিনায়কের স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল, ‘তিনি আমাদের ফুটবল ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম কিংবদন্তি। বাফুফে নির্বাহী সভায় আমরা এটি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’ জাকারিয়া পিন্টুর নামে কোনো স্টেডিয়াম কিংবা ক্রীড়া স্থাপনার নামকরণ করা যায় কি না, এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তাবিথ বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেন, ‘স্টেডিয়ামগুলো সরকারের অধীনে। আমরা নির্বাহী সভায় আলোচনা করে এই বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে পারি।’

জাকারিয়া পিন্টুর স্ত্রী হাসিনা পাঁচ বছর আগে ইন্তেকাল করেন। তিনি এক ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন। তিন মেয়েই প্রবাসী। একমাত্র ছেলে তানভীর বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতে কিছু দাবি জানিয়েছেন, ‘আপনারা সবাই মিলে বাবার প্রতি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন এতে আমরা খুব কৃতজ্ঞ। বাবার একটাই চাওয়া ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের একটি স্বীকৃতি (দল হিসেবে স্বাধীনতা পদক পুরস্কার পাওয়া)। তার ছেলে হিসেবে আমারও সেই দাবিই থাকবে।’

দল হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিটা না পাওয়ার একটা আক্ষেপ নিয়ে চলে গেলেন জাকারিয়া পিন্টু। এখন সরকার যদি তার পরিবারের দাবিটা বিবেচনায় নেয়, তবেই হয়তো তৃপ্তি পাবে জাকারিয়া পিন্টুর বিদেহী আত্মা।