ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দুর্বৃত্তরা থানা, পুলিশ ফাঁড়িসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করেছে। গত তিন মাসেও তা পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি গণভবন ও সংসদ ভবন থেকে লুট হওয়া বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) অস্ত্রও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ চিহ্নিত অপরাধীরা কিনছে। তাদের হাতে আসা অস্ত্র দিয়ে নানা অপকর্ম হচ্ছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন শঙ্কা থেকে পুলিশে উদ্বেগ আছে।
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ময়নুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদগুলো উদ্ধার করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। এসব অস্ত্র যাতে কোনো অপরাধীর হাতে না যেতে পারে, সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
গত ৫ আগস্ট প্রবল গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের স্থাপনাগুলো ব্যাপক হামলার শিকার হয়। এর আগে ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির দিন থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের স্থাপনায় হামলা, কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের বিদ্রোহ, পালিয়ে যাওয়া ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশে ৪৬০টি থানায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১১৪টি থানা-ফাঁড়িতে। এর মধ্যে শুধু আগুন দেওয়া হয়েছে ৫৮টিতে। ঢাকা মহানগরে ১৩টিথানা আক্রান্ত হয়েছে। আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৪ পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দুর্বৃত্তরা থানাসহ পুলিশের স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। এ সময় ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে ৫ হাজার ৭৪৯টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গুলি খোয়া গেছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণ যেমন টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস ক্যানিস্টার, কালার স্মোক গ্রেনেড ও ওয়াকিটকি লুট হয়। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ১৮২ রাউন্ড গুলি ও অন্যান্য উপকরণ, ৪ হাজার ৩১৭টি অস্ত্র। এখনো উদ্ধার করা যায়নি ১ হাজার ৪৩২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৭ রাউন্ড গুলি ও অন্যান্য উপকরণ।
পুলিশের তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় ১ হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র লুট করে। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না রাইফেল ৩৪৮টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না এসএমজি ৩০টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না এলএমজি ১৩টি, ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটারের চায়না পিস্তল ১৯৪টি, ৯ দশমিক ১৯ মিলিমিটারের ৫৫৯টি পিস্তল, ১২ বোরের ৫৯৮টি, ৩৮ মিলিমিটারের গ্যাসগান ১৫২টি ও ৩৮ মিলিমিটারের টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ৪টি রয়েছে। এসবের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ২১৭টি। ঢাকার বাইরে অস্ত্র লুট হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৯টি। উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৩১৭টি। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম নগরীর আট থানা ও আট পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়েছে ৮১৫টি, উদ্ধার হয়েছে ৬১৭টি। তাছাড়া গোলাবারুদ লুট হওয়ার মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৭ রাউন্ড গুলি রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত টিয়ার শেল, গ্যাস গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, গ্যাস ক্যানিস্টারসহ অন্যান্য গোলাবারুদ লুট হয়েছে ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯টি। এর মধ্যে টিয়ার শেল লুট হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৩৬টি, উদ্ধার হয়েছে ১৯ হাজার ৬১৩টি, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড লুট হয়েছে ১ হাজর ৪৭৫টি, উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ১৮২টি। সাউন্ড গ্রেনেড লুট হয়েছে ৪ হাজার ৭৩৩টি, উদ্ধার হয়েছে ৩ হাজার ২৫৪টি। পাশাপাশি ১ হাজার ৮৬টি ওয়াকিটকি সেট, ৫টি বেইজ স্টেশন, ৬টি রিপিটার ও ১১০টি ফিক্সড সেট লুট হলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, অস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম, বেতার যোগাযোগ ও অপারেশনাল সরঞ্জামাদির মজুদ ছিল। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনেও এসএসএফের অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদ ছিল।
৫ আগস্ট জনতা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করার পর সব অস্ত্র লুট হয়ে যায়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বেতার যোগাযোগের ডিভাইস ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ ৩২টি ভারী অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। থানা ও সরকারি স্থাপনার বাইরে ব্যক্তিগত অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে।
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে থানাগুলো সচল করা হয়। ওই মাসের মাঝামাঝি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। বিগত সরকারের সময় পাওয়া অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে সেসব অস্ত্র থানায় জমা দিতে বলা হয়।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও গোলাবারুদ লুটপাটের তুলনায় কম উদ্ধার হয়েছে। আমরা এসব আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও গোলাবারুদ চিহ্নিত অপরাধীদের কাছে বিক্রি হওয়ার আশঙ্কা করছি। দুর্বৃত্তরা কমমূল্যে অস্ত্র হাতবদল করছে বলেও আমরা তথ্য পেয়েছি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের কাছে গুলি বিক্রি করা হচ্ছে। দুর্বৃত্তদের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড অপরাধীদের যোগাযোগ থাকারও তথ্য মিলেছে। অপরাধীদের নজরদারি করা হচ্ছে। লুট হওয়া অস্ত্রে পুলিশ বাহিনীর সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে। এতে অস্ত্রগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। পুলিশের সবকটি ইউনিটপ্রধানদের নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব দুর্বৃত্ত লুটপাটের সঙ্গে জড়িত আছে, তাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দারা কাজ করছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে পুঁজি করে একটি সুবিধাভোগী চক্র অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানাভাবে চেষ্টা করছে। ঢাকাসহ সারা দেশে খুন, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মতো ভয়ংকর অপরাধ আগের চেয়ে বেড়েছে। রাত যত গভীর হয়, সড়কের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে অপরাধীদের হাতে। এমনকি বাসাবাড়িতেও অপরাধীরা ঢুকে পড়ছে। রাজধানীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিনতাই নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশের হিসাবে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সারা দেশে বিভিন্ন থানায় ১১১টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ২৩১টি ছিনতাই, ৫২২টি হত্যাকা-, ২৪টি দাঙ্গা ও ১ হাজার ৩২৭টি চুরির মামলা হয়েছে। পুলিশের ৫৮ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তবে দুই মাসে এত পরিমাণে হত্যা মামলা হওয়া মানে এ নয় যে, ওই সময়ই ঘটনাগুলো ঘটেছে। আগের অনেক ঘটনায়ও তখন মামলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৬ বছর ধরে ঢাকায় যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা কাজ করেছেন, তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। ঢাকায় যাদের আনা হয়েছে, তারাও কূলকিনারা করতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, ঢাকায় নতুন আসা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই রাস্তাঘাট, অলিগলি চিনতে পারছেন না। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। পুলিশের নীতিনির্ধারকদের বৈঠকেও দুর্বৃত্তদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।