সংসদে পাশ হলো ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

কোনো আলোচনা ছাড়াই ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) বিলটি সংসদে উত্থাপন করার পরপরই সেটা পাস করা হয়।

বিলটি স্থায়ী কমিটিতে না পাঠানো, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া, দ্রুততার সঙ্গে পাস করার সমালোচনা করে বিরোধী দল বলছে, একই দিনে উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগকে সংসদের জন্য খারাপ নজির। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে, যৌক্তিক হলে গ্রহণ করা হবে।

বুধবার বিকেল চারটার পর সম্পূরক কার্যসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল সংসদে তোলেন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাধারণত বিল উত্থাপনের পর সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। তবে সেটি না করে বিলটি সরাসরি পাসেরও প্রস্তাব করতে পারেন মন্ত্রী। এ নিয়ে সংসদে ২৮ মিনিট বিতর্ক হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করতে গেলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই আইনের মাধ্যমে ছয়টি পূর্ববর্তী আইনকে রহিত করা হচ্ছে। একই সাথে দুইটা প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে।

স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে এটা দেয়া হয়েছে, আপনি তিন দিনের বিষয়টা খন্ডন করেছেন। কিন্তু ৯ জুলাই এই আইনটি মন্ত্রিসভায় পাশ হয়েছে। আজকে ১৫ই জুলাই, ছয়টা দিন চলে গেল। এর মধ্যে আমাদেরকে এই তিন দিনের যেই নোটিশটা দেওয়ার কথা ছিল, ডকুমেন্টগুলো দেওয়ার কথা ছিল, দেওয়া হলো না কেন তার কোন জাস্টিফিকেশন কিন্তু পেলাম না।

বিরোধী দলের এই সদস্য আরও বলেন, এটা কমিটিতে না দিয়ে সরাসরি পাশ করার এত তাড়াহুড়া কি জন্য তারও কিন্তু কোন জাস্টিফিকেশন আমরা দেখছি না। এখানে কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বিলটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের বিষয়টি সপ্তম সংসদ থেকে শুরু হয়েছে। যে বিলটি আনা হয়েছে এটা কোন নতুন আইন নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে। যার ফলে ওভারল্যাপিং হচ্ছে ফাংশনে। ওয়ান উইন্ডোতে আমরা সার্ভিস পাচ্ছি না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এই বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ গুলো একই উদ্দেশে করা হয়েছে। সেগুলো জাস্ট মার্জার করা হচ্ছে একটা কর্তৃপক্ষের মধ্যে। এটি সংসদে আরও আগে আনতে পারলে তারা খুশি হতেন। কিন্তু আজ অধিবেশন শেষ হবে। এই বিলটার মধ্যে যদি জটিল কোন বিষয় থাকলে তিনি নিজেই এটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতেন। তিনি আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চান।

তখন নাজিবুর রহমান বলেন, আইন প্রণেতাদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে তাদের মৌলিক অধিকার এটাকে যাচাই বাছাই করা। সেখান থেকে বঞ্চিত করা মানে মৌলিক অধিকার এখানে ক্ষুন্ন হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাশ করার অনুমতি দেন তাহলে আমি মনে করি আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রনেতা হিসেবে সেটা আমাদের ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে। তবে তার আপত্তি নাকচ হয়।

পরে কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। উত্থাপনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেন।

তখন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, কয়েকটি ধারায় তাদের সংশোধনী আছে। সেটা কিভাবে দেবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সদস্য যে সমস্ত ধারাগুলোতে সংশোধনের কথা বলছেন। এখন বিধি মোতাবেক যেহেতু আপনি সবকিছু খন্ডন করেছেন তারটাও খন্ডন করে মৌখিকভাবে উত্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। আমরা নোট করব এবং সেই প্রেক্ষিতে যদি কোন সংশোধনী গ্রহণ করার থাকে তাহলে পরে আমরা সেটা গ্রহণ করব যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়।

এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এই অধিবেশনের আজকের শেষদিন আমরা চাই যে আমাদের এই দিনটা এই অধিবেশনের যেন গ্লোরিফাই হয়ে থাকুক। এখানে প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাশ করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম যে ভবিষ্যতে যেন সব কিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে। এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন। এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয় স্যাক্রিফাইস করলাম কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, একটা বিষয়কে তাড়াহুড়া করে একোমোডেট করতে গিয়ে অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব লঙ্গিত হচ্ছে এবং এইটা এই সংসদের জন্য ভালো কোন প্রেসিডেন্স হবে না।

বিলটি একই দিনে উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগকে সংসদের জন্য খারাপ নজির হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আইন বোধহয় এভাবে প্রণয়ন হয় না। মাননীয় স্পিকার। আইন তো বুঝে শুনে প্রণয়ন করতে হবে। ইতিহাসের দায়বদ্ধতা আমাদের আছে।’

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ‘রাইটলি পয়েন্ট আউট’ করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে সদস্যরা যে সমস্ত ধারার মধ্যে সংশোধনী আনতে চান, সেটা নিয়ে এলে যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। আগামী অধিবেশনেও সেটা হতে পারে।

তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মাননীয় মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মহান জাতীয় সংসদে আমরা প্রত্যাশা করছি সেই প্রতিশ্রুতি আপনি রক্ষা করবেন যৌক্তিকভাবে।

পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

বিলে যা আছে

পাস হওয়া বিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে।

এই কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হবে। একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। চেয়ারম্যান হবেন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরকার নিয়োগ দেবে। কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হবে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে দেশে বা বিদেশে শাখা কার্যালয় ও লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন করা যাবে।

নতুন কর্তৃপক্ষ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রচার চালানো, আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব অনুমোদন, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে।

বিদেশি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ, কর্মচারী ও পরামর্শক নিয়োগের শর্ত নির্ধারণ, ভিসার সুপারিশ ও কর্মানুমতি প্রদান, বিনিয়োগ চুক্তির খসড়া তৈরিতে সরকারকে সহায়তা এবং শিল্পের তথ্যভাণ্ডার তৈরির ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। সরকারি শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি, স্থাপনা, শেয়ার ও স্বত্ব অধিকতর উপযোগী অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার, হস্তান্তর, ইজারা বা কৌশলগত বিক্রয়ের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেবে কর্তৃপক্ষ।

গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী

কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী বা তার মনোনীত ব্যক্তি। অর্থ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিল্প, বাণিজ্য এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা বোর্ডের সদস্য হবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং বেসরকারি খাতের চার প্রতিনিধি বোর্ডে থাকবেন। বেসরকারি খাতের চার প্রতিনিধির মধ্যে দুজন নারী হতে হবে। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বোর্ডের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত