লা বোম্বোনেরায় ৬০ হাজার দর্শকের সামনের ম্যাচের ৫৫ মিনিটের জাদুকরী মুহূর্তের অবতারণা। বক্সের কাছে লিওনেল মেসির পায়ে বল দেখে বিপদের গন্ধ পেয়ে পেরুর দুই ডিফেন্ডার তাকে দুই পাশ থেকে আটকানোর চেষ্টা করেন। ছুটে আসেন আরও এক ডিফেন্ডার। কয়েক মুহূর্তের জন্য ত্রিভুজ আকৃতির সেই রক্ষণজালের ঠিক মাঝে মেসি। ততক্ষণে বক্সের ভেতরে দাঁড়িয়ে যান লাওতারো মার্তিনেজ। তার অবস্থান এক পলকে দেখে নিয়ে বাঁ পায়ে বলটা চিপ করলেন মেসি। বাতাসে ভাসতে ভাসতে সেই বল দেখে শূন্যে লাফিয়ে চলন্ত বলেই বাঁ পায়ের কিক নেন মার্তিনেজ। সিজার কিকও নয়, বাইসাইকেলও নয়। ‘পিরুয়েত্তে’, স্প্যানিশ ভাষায় ব্যালে নাচের মুদ্রা যেন। পেরুর গোলকিপার পেদ্রো গ্যালেসে বাঁ দিকে ড্রাইভ দিয়েও কিছু করতে পারেননি। ৫৫ মিনিটে মার্তিনেজের এই গোলেই শেষ পর্যন্ত পেরুকে হারিয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে জয়ে ফিরেছে আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ধারালো হলেও পোস্টের লক্ষ্যভ্রষ্ট শটের কারণে গোল পায়নি। জুলিয়ান আলভারেজ এবং ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে না গিয়ে হতাশা বাড়িয়েছে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে মার্তিনেজের একমাত্র গোলেই জয় নিশ্চিত করে স্কালোনির দল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সমান ৩২ গোল এখন মার্তিনেজের। আর এটি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের ১ হাজার ৯৯৯তম গোল। মেসি নিজেও ভাগ বসিয়েছেন একটি রেকর্ডে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি ল্যান্ডন ডনোভানের গড়া সর্বোচ্চ ৫৮ অ্যাসিস্টের রেকর্ডে বসিয়েছেন মেসি।
এই জয়ের ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তারা। ১২ ম্যাচে ২৫ পয়েন্ট নিয়ে চূড়ান্তপর্বও অনেকটা নিশ্চিত করে ফেলেছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। উরুগুয়ের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে ব্রাজিল।
প্রথম লেগে উরুগুয়ের কাছে হেরে গিয়েছিল ব্রাজিল। কদিন আগে ভেনেজুয়েলার মতো দলের সঙ্গে ড্র করার পর সমালোচনা জেঁকে বসেছিল কোচ দরিভাল জুনিয়রের ওপর। সে থেকে বের হতে পারলেন না তিনি। ঘরের মাঠ সালভাদরে ফেদেরিকো ভালভার্দের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আরেকটি হারের শঙ্কায় পড়ে যায় ব্রাজিল। শেযপর্যন্ত গারসনের গোল রক্ষা করেছে তাদের।
ব্রাজিল যে খুবই বাজে খেলেছে, তা নয়। ম্যাচের ৬১.৫ শতাংশ সময় বল দখলে রেখেছে, ১৮টি শট নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে পোস্টে রাখতে পেরেছে মাত্র তিনটি শট। উরুগুয়ে আটটি শট নিয়ে পোস্টে রাখতে পেরেছে দুটি শট। ম্যাচের শুরুতেই গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন ব্রাজিল তারকা ভিনিসিয়ুস। তিন মিনিটে ডান প্রান্তের দুরূহ কোণ থেকে তার ডান পায়ের শট উরুগুয়ে গোলকিপার সের্হিও রোচেটের ডান দিকের পোস্ট ঘেঁষে চলে যায়। ২১ মিনিটে দারউইন নুনেজের পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া শট ব্রাজিলের পোস্টে রাখতে পারেননি ফেকুন্দো পেলিস্ত্রি। এক মিনিট পর উরুগুয়ে লেফটব্যাক মাথিয়াস অলিভেরার হেডও পোস্টের বাঁ দিক দিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ২৮ ও ৩৫ মিনিটে ব্রাজিল তারকা রাফিনহাও উরুগুয়ের পোস্টকে চোখ রাঙিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন। তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে গোলের সবচেয়ে ভালো সুযোগ পায় ব্রাজিল। রাফিনিয়ার ক্রস পেয়ে খুব কাছ থেকে হেড করেছিলেন ব্রাজিল স্ট্রাইকার ইগর জেসুস। দারুণ দক্ষতায় তা রুখে দেন গোলকিপার রোচেটে।
বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় এগিয়ে যায় উরুগুয়ে। বক্সের ভেতরে বাঁ প্রান্ত থেকে বল একটু টেনে ভালভার্দেকে পাস দেন উরুগুয়ে লেফট উইঙ্গার ম্যাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো। ভালভার্দে বক্সের ঠিক মাথায় বল ডান পায়ের বাঁকানো শটে এগিয়ে নেন ব্রাজিলকে। তবে সাত মিনিট পর গারসনের গোলটি মুগ্ধ করে দেয় ৬০ হাজার দর্শককে। ডান প্রান্ত থেকে উড়ে আসা ক্রস বক্সে হেড করে ক্লিয়ার করেছিলেন উরুগুয়ের এক ডিফেন্ডার। কিন্তু বক্সের ঠিক মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা গারসনের পায়ের ওপর এসে পড়ে বলটি। বাঁ পায়ের বুলেট শটের ভলিতে বল জালে পাঠান ফ্ল্যামেঙ্গো ডিফেন্ডার। ব্রাজিলের জার্সিতে তার প্রথম গোলটিই হয়ে রইল স্মরণীয়।
ম্যাচের শেষ দিকে ব্রাজিলের গোলের দুটি সুযোগ নষ্ট করেন রাফিনিয়া ও বদলি নামা লুইস হেনরিক। ফন্তে নোভে অ্যারেনায় শেষ দিকে স্বাগতিক দর্শকের দুয়োও শুনতে হয় দরিভালের দলকে। ম্যাচ শেষে রাফিনিয়া এ নিয়ে বলেছেন, ‘দুয়োটা সম্ভবত ম্যাচের ফলের জন্য। কারণ, আমরা মাঠে নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছি।’ কোচ দরিভাল বলেছেন, ‘সঠিক পথেই আছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল, ‘প্রতিমুহূর্তেই উন্নতি হচ্ছে। সব খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সেই তা দেখছি। শেষ দুই ম্যাচে আমরা ভালো খেলেছি। ভাগ্যটা আরেকটু ভালো হতে পারত। আরও একটি গোল পেলে দ্বিতীয়স্থানে থেকে বছর শেষ করতে পারতাম। আমার মনে হয়, অনেক কিছুই পাল্টেছে। আমরা সঠিক পথেই আছি। আমরা ফল চাই এবং সেটার খুব কাছাকাছিই আছি।’ এখনো ব্রাজিলের আদর্শ দলটি ঠিক করতে পারেননি, সেটিও স্বীকার করে নিয়েছেন পরোক্ষভাবে, ‘আদর্শ দলটা বের করতে আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে, যে দলটা সমর্থকদের আরও আত্মবিশ্বাস এনে দেবে।’
বারানকিয়ায় অন্য ম্যাচে কলম্বিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে টেবিলের তিনে উঠে এসেছে ইকুয়েডর। ১২ ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ১৯ পয়েন্ট। সমান ম্যাচে ১৯ পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে ইকুয়েডরের সঙ্গে পিছিয়ে চারে কলম্বিয়া। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষ ছয় দল সরাসরি খেলবে বিশ্বকাপে। সপ্তম দলটিকে দিতে হবে প্লে অফ পরীক্ষা।