স্বচ্ছতার তৎপরতা

বাংলাদেশে আরও একটি বড় আকারের গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী সরকারের পতন হয়েছে। তবে সরকার পতনের আগে অভ্যুত্থান দমনে সশস্ত্র হামলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। এ কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশের বিধান বাদ দেওয়াসহ কমপক্ষে ২০টি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। গত বুধবার সচিবালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের সংশোধনীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে সংগঠনকে শাস্তি দেওয়ার বিধান ছিল। তবে উপদেষ্টা পরিষদ মনে করেছে, এই আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলে তা আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বরং বিদ্যমান অন্যান্য আইনেই এর সুযোগ আছে বলে তারা মনে করেন। ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কমুক্ত রাখতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই দল নিষিদ্ধের ব্যাপারটি বাদ রাখা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতাধীন অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩’ প্রণয়ন করা হয়। রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং এই আইনের বিচারকাজ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের উত্থাপিত বিভিন্ন সুপারিশের আলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধিক সংশোধন সমীচীন ও আবশ্যক। এই প্রেক্ষাপটে আইন ও বিচার বিভাগ আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর সংজ্ঞা যুগোপযোগীকরণ, অপরাধের দায় নির্ধারণ, অডিও ও ভিডিওর মাধ্যমে বিচারকাজ ধারণ এবং সম্প্রচার, বিদেশি কাউন্সেলরের বিধান, বিচারকালে অভিযুক্তের অধিকার, অন্তর্বর্তী আপিল, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা-সংক্রান্ত বিধান, তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্র্তৃক তল্লাশি এবং জব্দ করার বিধান, পর্যবেক্ষক, সাক্ষীর সুরক্ষা, ভিকটিমের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষার বিধান সংযোজন করে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘আমরা একদম ডিসেন্টওয়েতে, ফেয়ারওয়েতে বিচারটা করতে চাই। এজন্য এই প্রভিশনটা বাতিল করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনুভব করেছি, কোনো রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো সংগঠন তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রমের জন্য নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হয় বা দাবি ওঠে সমাজে, তাহলে আমাদের অন্যান্য আইন রয়েছে, সেসব আইনে নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে।’ অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সংশোধনীর মধ্যে আছে অপরাধের স্থান নিয়ে বিধান। এর আগে, কিছু কিছু অপরাধের স্থল ঠিক করা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এখন বাংলাদেশের বাইরেও যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আমলযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, সেগুলোও নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বিবেচনায় নেওয়া যাবে।

প্রযুক্তির বিকাশে এখন ছবি তোলা, অডিও-ভিডিও ইত্যাদি করা মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও রেকর্ড সংরক্ষণের জন্যও এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মামলার স্বচ্ছতা রক্ষায় এসব রেকর্ড জরুরি। ফলে নতুন সংশোধনীতে আদালতের সম্মতিক্রমে প্রসিডিংয়ের রেকর্ড উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। একটা মামলার প্রসিডিং চলছে, এটা চলা অবস্থায় কোনো একটা পয়েন্টে বা ছোট্ট একটা অর্ডারের বিপক্ষে সংক্ষুব্ধ কেউ আপিল করতে পারবে, তবে তা ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ছাড়াও আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে বিচারকাজ পর্যবেক্ষণে বিদেশ থেকে পর্যবেক্ষক আনা যাবে, যা আগের আইনে সম্ভব ছিল না।

ন্যায্যতা আর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করা অতি জরুরি। তবে অতীতে এ ধরনের বিচারকাজকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এর ফলে বিচারকাজ বিতর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেশের নতুন পরিস্থিতিতে আশা থাকবে যে, এসব বিচার যাতে সুষ্ঠু হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয় এবং দেশের বিচারব্যবস্থা ও ন্যায্যতার ওপর মানুষের আস্থা ফিরে আসে।