রিকশার সমস্যা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে উভয়ের কাছে একটা বড় আতঙ্কের নাম ‘রিকশাওয়ালা’। শিক্ষিত, শহুরে, মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিতে বহুকাল ধরে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে যে, মেয়ে যদি ফেল করে, তবে বাপ রিকশাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে আর ছেলে যদি ফেল করে, তবে সেই অপোগ-ের জীবনে আর কোনো গতি হবে না বিধায় তাকে একটা রিকশা কিনে দেওয়া হবে। অপদার্থ তরুণ তা দিয়ে যদি জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, এই আশায়।

এই আপাত নির্দোষ কৌতুকের মধ্যে মিশে আছে রিকশাওয়ালাদের প্রতি তীব্র অপমান, সমাজে রিকশাওয়ালার স্থান এবং রিকশাচালনার রাজনৈতিক অর্থনীতি। রিকশাওয়ালা সমাজের চোখে সবচেয়ে নিচু পেশা, তাই বোঝাতে ফেল করা ছেলেমেয়েদের অপমান করতে, তাদের সেই কাতারে নামিয়ে আনা হয়। অন্যদিকে, আরেকটা বিষয়ও এখানে উঠে আসে, যে কেউ চাইলেই রিকশা চালাতে পারে। এসএসসি ফেল করা ছেলে হোক কিংবা গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে আসা মানুষদের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে রিকশা চালিয়ে উপার্জন করা। গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের জনপ্রিয় গান ‘ও সখিনা... আমি এহন রিশকা চালাই ঢাহা শহরে’ সেই ব্যাপারটাকে সমর্থন করে। প্রখ্যাত ইংরেজ লেখক জর্জ ওরওয়েল বলতেন, ভারতবর্ষে যত দিন বেকারত্বের সমস্যা থাকবে, তদ্দিন রিকশাও থাকবে। ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন নামক বইয়ে, সে সময় আর্থিক সংকটে থাকা, তরুণ লেখক ওরওয়েল উল্লেখ করেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোয় বিপুল পরিমাণ মানুষকে কোনোমতে জীবনধারণের জন্য রিকশার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই মানুষগুলো অমানবিক জীবনযাপন করেন, তাদের কোনো ধরনের সামাজিক সম্মান নেই এবং অবর্ণনীয় কষ্ট করে সামান্য আয় করেন। এরপর তার আসলে শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে কথা বলার ফুরসত বা শক্তি থাকে না। ওরওয়েলের ভাষায়, ‘তাদের কেউ কেউ রোগাক্রান্ত, তাদের কারও কারও বয়স পঞ্চাশ। মাইলের পর মাইল তারা রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে, মাথা নত করে, রিকশার চাকা টেনে নিতে থাকেন, তাদের ধূসর গোঁফ বেয়ে ঘামের বিন্দুগুলো টপটপ করে পড়তে থাকে। আর যখন তারা অত্যন্ত আস্তে যান, তখন যাত্রী তাকে ‘বাইনচুত’ বলে গালাগাল দেন।’ আস্তে চালানোর ব্যাপারে কবীর সুমনের গান পেটকাটি চাদিয়ালের কথা মনে পড়ে যায়।

‘বয়স বারো কি তেরো, বড়জোর চোদ্দ,

রিকশা চালাতে শিখে নিয়েছে সে সদ্য

...সওয়ার বাবুটি ভাবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

বিচ্ছু ছোঁড়াটা বড় আস্তে চালাচ্ছে।’

সুমনের এই গানেও কিন্তু উঠে আসে যে, বেকারত্ব মেটাতে এমনকি বারো-চোদ্দ বছরের শিশুরাও রিকশা টেনে যায়। সুমনের গান শুনে আমরা কেউ কেউ গ্লানিতে ভুগি, আবার কেউ কেউ হয়তো সওয়ার বাবুটির মতোই শ্রেণি ঘৃণায় রিকশাচালকের অমানবিক অবস্থাকে উপেক্ষা করি। কিন্তু এ বিষয়টা স্পষ্ট যে, রিকশা ব্যাপারটা পরিবহন হিসেবে গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক অর্থনীতিতেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বেকারত্ব তীব্র এবং অর্থনীতির বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক, রিকশা সেখানে আর্থিকভাবে নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য টিকে থাকার অবলম্বন। অন্যদিক দিয়ে দেখলে আদতে তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। কারণ, বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পেরে, কর্মদক্ষ করে কর্মসংস্থান করতে না পেরে, রিকশা ধরিয়ে দিয়ে এসএসসি ফেল ছাত্রের বাপের মতোই হাত-পা ঝাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের আরও একটা দায় আছে, আর তা হচ্ছে সড়কব্যবস্থার অপ্রতুলতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় প্রধান (প্রাইমারি), অপ্রধান (সেকেন্ডারি), সংযোগকারী (কানেকটিং), স্থানীয় এবং চিপাগলি মিলিয়ে সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে অর্ধেক সড়কেই বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ির মতো যান্ত্রিক বাহন চালানোর উপায় নেই (রিকশা কেন চলে? কারা চালান? কারা চড়েন? মওদুদ রহমান, সর্বজনকথা দশম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)। সংগত কারণেই রিকশা ঢাকাবাসীর সবচেয়ে জনপ্রিয় যানবাহন। ঢাকার যাতায়াতে ব্যবহৃত মোট বাহন ব্যবহারের রিকশা ৩৫ শতাংশ, এরপর ধারাবাহিক তালিকায় রয়েছে বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি, যা কি না যথাক্রমে ২১ এবং ১০.৫ শতাংশ। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মাথাপিছু সড়কের দৈর্ঘ্যরে পরিমাণ ১ ফুটেরও কম (০.২১৩ মিটার), যেখানে উন্নত শহরের কথা বাদ দিয়ে অন্য অনেক উন্নয়নশীল দেশের উদাহরণ টানলেও দেখা যায়, সেখানে মাথাপিছু সড়কের এই দৈর্ঘ্যরে পরিমাণ ১৫ ফুট থেকে দেড় ফুট (৪.৫ থেকে ০.৫ মিটার)

বার্মিংহামে জন্ম নেওয়া ইংরেজ গবেষক রব গ্যালাঘার বাংলাদেশের রিকশা নিয়ে বিশদ গবেষণা করার পর ১৯৯২ সালে জরপশংযধংি ড়ভ ইধহমষধফবংয বইটি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দেখান, পুরান ঢাকায় ১৯ ফুট চওড়া একমুখী চলাচলের এক রাস্তায় এক ঘণ্টায় ৩ হাজার ৫০০টি রিকশা একটি নির্দিষ্ট স্থান অতিক্রম করতে পারে, ঠিক একই অবস্থা বজায় রেখে ২০ ফুট চওড়া একমুখী রাস্তায় এক ঘণ্টায় ১ হাজার ৩০০টি গাড়ি চলতে পারে। প্রতিটি রিকশায় ১ দশমিক ২ জন আর প্রতিটি ব্যক্তিগত গাড়িতে ২ দশমিক ২ জন যাত্রী বিবেচনায় এক ঘণ্টায় গাড়ির তুলনায় রিকশায় ১ হাজার ৩৪০ জন যাত্রী বেশি চলাচল করতে পারে। অর্থাৎ, যেকোনো বিচারেই রাষ্ট্রের অক্ষমতা রিকশা দিয়ে কিছুটা হলেও ঢেকে রাখা যাচ্ছে। রিকশা না থাকলে পরিবহনব্যবস্থা আরও বেশি বিপর্যয়ে পড়ত। রিকশাকে যানজটের কারণ ও শহরের গতি শ্লথ করার যে অভিযোগ তা তো সত্য নয়ই, বরং এসব সমস্যার কারণ নগর অবকাঠামো এবং সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থার অভাব। আর রিকশা সেখানে ত্রাণকর্তা। ওরওয়েলের কথাটা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রের বেলায়ও পরিবর্তিত হয়নি। লাখো লাখো রিকশার উপস্থিতি এই কথা প্রমাণ করে যে, এই রাষ্ট্র নাগরিকের কল্যাণ করতে ব্যর্থ। ঔপনিবেশিক কায়দাতেই সে নাগরিকদের আর্থিক এবং পরিবহন সমস্যার সমাধান করে।

ফলত, রিকশা-সংক্রান্ত ব্যাপারটা একেবারেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাপার এবং এর জন্য প্রশ্নটা তুলতে হবে রাষ্ট্রকে। সম্প্রতি, ঢাকায় রিকশা সমস্যা তর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলবে কী চলবে না এই বিতর্কে। নাগরিক সমাজে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। এই রিকশাগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায় এরা নিয়মিত দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। দিন দু-এক আগেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী নিজ ক্যাম্পাসেই ব্যাটারিচালিত রিকশায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। ফলত, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধের বিষয়ে জনমত তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি আদালতে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে অটোরিকশা বাতিলের ঘোষণা এসেছে। এর প্রতিবাদে রিকশাচালকরা গতকাল বৃহস্পতিবার শহরকে কার্যত অচল করে দেন। সমাজের সবচেয়ে ব্রাত্য মানুষগুলো, যাদের জর্জিও আগামবেন হোমো সাকের বলতেন (বৃষ্টির দিনে রিকশাওয়ালাদের কী হয় এবং তুমি কে আমি কে ব্যাটারি ব্যাটারি শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত দুটি কলামে এ বিষয়টিসহ রিকশাওয়ালাদের সামাজিক অর্থনীতি এবং ব্যাটারি রিকশার পক্ষে বিশদে বলেছি) তারাই এখন শহরের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাপার। কথা হচ্ছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনার কারণে যদি তা রাস্তা থেকে তুলে নিতে হয়, তবে সেই যুক্তিতে মোটরসাইকেল, বাসসহ সব যানবাহনই তুলে দেওয়া উচিত। কারণ এসবের কারণে বহু গুণ দুর্ঘটনা হয়। রিকশায় যেসব কারণে দুর্ঘটনা হয়, এসব যানবাহনেও সেই সেই কারণ বিদ্যামান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সংকট, রাস্তার অপ্রতুলতা, লাইসেন্স ব্যবস্থায় দুর্নীতি। যে পরিবহনই রাস্তায় নামুক, তার চালকের অতি অবশ্যই যথাযথ দক্ষতা ও অনুমোদন লাগবে, কারণ তা জীবনমরণের ব্যাপার। অথচ রিকশার বেলায় লাইসেন্সের কোনো বালাই নেই বললেই চলে, আর আগেই যেটা বলেছি, কোনো ধরনের ট্রেনিং ছাড়া যে কেউ রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে পারেন। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কোনো আধুনিক শহরে লাখো লাখো ট্রেনিংবিহীন মানুষ রাস্তায় যানবাহন নিয়ে নেমে পড়তে পারেন না। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, এর পেছনে আছে অবৈধ লাইসেন্সের বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রের উদাসীনতা। রিকশা চালানোর অনুমোদন পেতে হলে অতি অবশ্যই সুষ্ঠু ট্রেনিং লাগবে। দায়টা মূলত রাষ্ট্র তথা কর্র্তৃপক্ষের, রিকশাচালকদের নয়। বরং তারা বিরাট পরিমাণ উৎকোচ দিয়ে এই ব্যাপারগুলো সামলায়। আর যদি যান্ত্রিক ত্রুটি থাকে, তবে সেগুলো ঠিক করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। রিকশার যে বাজার, সে তুলনায় এর উন্নয়ন প্রকল্পে যৎসামান্যই খরচ হওয়ার কথা। প্রযুক্তির একটি প্রবণতা হচ্ছে, একে নিষিদ্ধ করে আটকে রাখা যায় না। যখন প্রথম গাড়ি আবিষ্কার হয়, তখনো অনেকে দুর্ঘটনার দোহাই দিয়ে একে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। তাদের কথা শুনলে আমরা এখনো ঘোড়ার গাড়ি বা পালকিতে চড়তাম। বাস্তবে এমনটা হয় না। গাড়ির যেমন শনৈঃশনৈ উন্নতি হয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রযুক্তিকেও তাই করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন হচ্ছে, রাষ্ট্রের সংস্কার চলছে। কিন্তু রিকশার মতো রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এত জরুরি বিষয় নিয়ে কমিশন নেই। রিকশাবিষয়ক সমস্যাগুলো সমাধানে একটা রিকশা কমিশন কিংবা গণপরিবহন কমিশন করে তার আওতায় সার্বিকভাবে এ সমস্যার মোকাবিলা জরুরি। কারণ সমস্যাটা জটিল এবং জরুরি। নিষিদ্ধ করে দেওয়ার মতো ত্বরিত সিদ্ধান্ত না নিয়ে এর আগাপাশতলা সংস্কার জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

faizbsu002@gmail.com