রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না বসুন্ধরা কিংসের রোমানিয়ান কোচ ভ্যালিরিউ তিতা। মাঠে যখন শিষ্যরা একটা প্রথম নিজেদের করে নিয়েছে মোহামেডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে, তখন সেই উদযাপন দেখতে দেখতে অঝোরে কেঁদে ফেললেন মধ্যবয়সী কোচ। ম্যাচের আগের দিনই বলেছিলেন দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে এতটা খারাপ সময় কখনো আসেনি। ভুটানে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপপর্বে টানা তিন ম্যাচ হারের আঘাত তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল খুব করে। বাংলাদেশ ২.০ চ্যালেঞ্জ কাপ জয়ের মধ্য দিয়ে যেন বুক থেকে হাজার মণ ওজনের পাথর নেমে গেছে তার। আর বসুন্ধরা কিংসও ঘরের মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে। তাতে ইতিহাসেও উঠে গেছে কিংসের নাম। জুলাই-আগস্ট শহীদদের স্মৃতিতে হওয়া এই ম্যাচের প্রথম শিরোপাটা জিতল দেশসেরারাই। গত মৌসুমে ট্রেবল জিতে অন্য উচ্চতায় চলে যাওয়া দলটিকে নিয়ে খানিকটা শঙ্কা জেগেছিল এএফসির আসরে বাজে পারফরম্যান্সে। আগের দিন তিতাও স্কোয়াডের দুর্দশার কথা বলে শঙ্কাটা বাড়িয়েছিলেন। সপ্তম মিনিটে তপু বর্মণের ভুল আর সুলেমান দিয়াবাতের নির্ভুল নিশানাভেদে গোল হজমের পর এই কিংসকে নিয়ে ভয়টা জেঁকে বসেছিল। তবে ঘুরে দাঁড়াতে যাকে জ্বলে উঠতে হতো, সেই মিগেল ফিগেইরা দেরিতে হলেও জাগলেন। স্বরূপে ফিরলেন ঠিক নিজের মতো করে। প্রথমে তপু ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিমকে দিয়ে গোল করালেন। পরে জয়টা নিশ্চিত করলেন যোগ করা সময়ের অসাধারণ গোলে। তাতেই ঘরের মাঠ কিংস অ্যারেনায় আরেকটি শিরোপা উদযাপনে মাতল বসুন্ধরা কিংস।
গত দুই মৌসুমে ঘরোয়া ফুটবলের সেরার লড়াইটা সীমাবদ্ধ বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডানে। ট্রেবল জয়ের মৌসুমে এই মোহামেডানই কিংসকে যতটা ভোগানোর ভুগিয়েছে। এই মাঠে অপরাজিত থাকার রেকর্ডটাও ভেঙেছে গত লিগে মোহামেডানের কাছে হেরে। এই ম্যাচেও সে রকম কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিল আলফাজ আহমেদের শিষ্যরা। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে বাঁ-দিক দিয়ে আক্রমণে ওঠা নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড ইমানুয়েল সানডেকে রুখতে পারেননি তপু বর্মণ। অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে বক্সে মাপা ক্রস ফেলেছিলেন সানডে। অনেকটা লাফিয়ে তাতে দিয়াবাতের নিখুঁত হেড রুখতে পারেননি কিংস কিপার আনিসুর রহমান জিকো। ২৬ মিনিটে ব্যবধান বাড়তে পারত মোহামেডানের। তবে বাঁ-দিক থেকে আক্রমণে ওঠা রহিমউদ্দিনের ক্রসে কেউ মাথা ছোঁয়াতে পারেননি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মোহামেডানের রক্ষণে ভীতি ছড়িয়েছিল কিংস। তবে ফিনিশারের ব্যর্থতায় ভেস্তে যায় সব প্রচেষ্টা। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বক্সের জটলা থেকে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার জোনাথন ফার্নান্দেজের শট বাইরে গেলে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয়ার্ধে এক গোলের লিড ধরে রাখতেই মনোযোগী ছিল মোহামেডান। প্রথমার্ধের মতো প্রতি আক্রমণে ওঠার আগ্রহেও ভাটা পড়ে। অন্যদিকে ম্যাচে ফিরতে মরিয়া কিংস একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে। ৫২ মিনিটে ফাহিমের শট দূরের পোস্ট গলে বেরিয়ে যায়। আর ৬২ মিনিটে কিংস সমর্থকরা মাঠে স্মোক ফ্লেয়ার ছুড়ে মারলে প্রায় ১০ মিনিট খেলা থাকে বন্ধ। গোলাপি ধোঁয়ায় খেলা সম্ভব ছিল না। এতে কিংসের আক্রমণে ভাটা পড়ার ভয় তৈরি হয়েছিল। তবে হয়েছে উল্টো। মোহামেডানই যেন এই বিরতিতে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। খেলা শুরু হতেই কিংস সমতায় ফিরেছে। মিগেলের কর্নার নিচে নামার মুখে পা চালিয়ে দেন আনমার্কড তপু, মোহামেডান কিপার সুজনকে পরাস্ত করে তা জালে প্রবেশ করতেই জেগে ওঠে কিংসের গ্যালারি। এই গোলে ম্যাচের লাগাম পুরোপুরি চলে যায় কিংসের আয়ত্তে। ৮১ মিনিটে মিগেলের আরেকটি অ্যাসিস্টে শূন্যে উড়ে অসাধারণ ভলিতে গোল করেন ফাহিম। ৮৯ মিনিটে বদলি ফরোয়ার্ড শেখ মোরসালিন হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে গড়বড় না পাকালে জয়টা আরও বড় হতে পারত। তবে যোগ করা সময়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন মিগেল। মিনহাজুল আবেদীনের ভুলে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারকে পায়ের কারিকুরিতে বিভ্রান্ত করে শট নেন ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার। সুজন ঝাঁপিয়ে তা রুখতে পারেননি। এমন গোলের পরও ক্ষুধা মেটেনি। তাই দূর থেকেই সুজনকে পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মিগেল জ্বলেছেন বলেই কিংসে হয়েছে শিরোপা উৎসব। যদিও ম্যাচসেরার পুরস্কারটা অবিশ্বাস্যভাবে গেছে তপু বর্মণের কাছে!
নতুন বাংলাদেশে, নতুন ফুটবল প্রশাসনের অধীনে নতুন এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে মাঠে গড়াল ফুটবল মৌসুম। তবে চ্যাম্পিয়নের রূপটা বদলায়নি। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার মাঝেও সেরা সেই বসুন্ধরা কিংসই।