মহারাষ্ট্র

উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পাওয়ারের শেষের শুরু

অর্ধ শতক ধরে মহারাষ্ট্রের মারাঠা রাজনীতির ব্যাটন ছিল ঠাকরে পরিবারের হাতে। তবে বছর দুয়েক আগে দলের মধ্যে বিভাজন, প্রতীক এবং নাম নিয়ে টানাটানিসহ নানা কাণ্ডে পর্যুদস্ত হয়ে ওঠে কট্টর জাতীয়তাবাদী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটি। যার ফলশ্রুতিতে দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা একনাথ শিন্ডে দলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ককে নিয়ে বিদ্রোহ করার পর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে শিবসেনা। 

শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা হাত মেলায় ভারতের আরেক হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী সংগঠন বিজেপির সঙ্গে। আর দলটির প্রতিষ্ঠাতা বালা সাহেব ঠাকরের পুত্র উদ্ধব ঠাকরে আরেক অংশ নিয়ে জোট গড়েন কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের সঙ্গে। এর থেকেই কার্যত ঠাকরে পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের রং মলিন হতে থাকে। কিন্তু সবশেষ বিধানসভা ভোটে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঠাকরে পরিবারের শিবসেনা তার অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। 

ঠাকরে পরিবারের মতো রাজ্যটির রাজনীতিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছে মহারাষ্ট্রের আরেক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি- এনসিপি। মহারাষ্ট্রের পুরোধা রাজনীতিক শরদ পাওয়ারের দলও ভাঙনের মুখে পড়ে। চাচার দল থেকে বেরিয়ে বিজেপি ও শিবসেনার (শিন্ডে) সঙ্গে জোট গড়েন ভাতিজা অজিত পাওয়ার। 

ফলে মহারাষ্ট্রের এই ভোট একদিকে যেমন ছিল জটিল রাজনীতির লড়াই, অন্যদিকে ছিল উদ্ধব ঠাকরে- একনাথ শিন্ডে ও শরদ পাওয়ার-অজিত পাওয়ারের মর্যাদার লড়াই। আর সে লড়াইয়ে উদ্ধব ও শরদ পাওয়ারের হার মহারাষ্ট্রে দল দুটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিধানসভার ২৮৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ২৩৬টি আসন। অন্যদিকে শিবসেনা (উদ্ধব)-এনসিপি-কংগ্রেসের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।

হিন্দুত্বের স্লোগান এবং মারাঠাদের স্বার্থরক্ষার দাবি সামনে রেখে ১৯৬৬-তে শিবসেনা গড়েছিলেন কার্টুনিস্ট ও রাজনৈতিক স্যাটায়ারিস্ট বালা সাহেব ঠাকরে। মারাঠাদের স্বার্থ রক্ষার কথা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদের কথা ছিল বালাসাহেবের তুরুপের তাস। অতীতেও বহুবার ভাঙন দেখেছে শিবসেনা। তবে বালাসাহেব ঠাকরে এসব ভাঙন সামলে নিয়ে শিবসেনার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

দলটিতে নানা সময়ে ভাঙনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দলের উদ্ধবের গুরুত্ব বৃদ্ধি। শিবসেনায় উদ্ধবের উত্থানের পরই দল ছাড়েন অনেকে। শুধু দলের নেতারা নয়, বালা সাহেবের পর যাকে দলটির উত্তরসূরি বলে ভাবা হচ্ছিল সেই রাজ ঠাকরেও দল ছেড়ে বেরিয়ে যান। এ ছাড়া ছগন ভুজবল, গণেশ নায়েক, সঞ্জয় নিরুপমের মতো অনেক নেতাই নানা সময়ে বালাসাহেবের হাত ছেড়েছেন অনেকেই। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে এসে বাবার ছত্র ছায়ায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, বালা সাহেবের মতো নেতৃত্ব গুণের প্রকাশ করতে পারেননি উদ্ধব ঠাকরে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রীর ওপর থেকে বালাহাসেবের নিয়ন্ত্রণ যেতেই, শিবসেনার ওপর থেকেও কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন উদ্ধব। সেই সঙ্গে বাল ঠাকরে সরকারকে দূরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করলেও, উদ্ধব নিজেই মূখ্যমন্ত্রী হওয়ায় দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফলে দলটির অন্যান্য নেতাদের এর ফলে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার যে সম্ভাবনা থাকত সেই সুযোগ না থাকায় অনেক নেতাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একনাথ সিন্ধের বিদ্রোহের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। 

ওরলি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে উদ্ধব পুত্র আদিত্য ঠাকরে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তবে রাজ ঠাকরের ছেলে অমিত ঠাকরে মাহিম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়লেও জিততে পারেননি। ফলে ক্রমেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে ঠাকরে পরিবার।

নির্বাচনের আগেই বেশি দিন সক্রিয় রাজনীতিতে না থাকার আভাস দিয়েছিলেন শরদ পাওয়ার। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর ধারণা করা হচ্ছে দ্রুতই রাজনীতির অধ্যায় সমাপ্ত হতে পারে তার। ভোটে মহাবিকাশ আগাদি জোটের হয়ে ৮৭টি সিটে লড়ে মাত্র ১০টিতে জিতেছে এনসিপি (শরদ)। সাফল্যের হার মাত্র ১১.৪৯ শতাংশ। শরদের দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারে যা সর্বনিম্ন। বছর দুয়েক আগেই ভাতিজা অজিত পাওয়ার দল ছেড়ে বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। ভোটের লড়াইয়ে ভাতিজার কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক শরদ।

বিশ্লেষকরা মনে করছে, সময়ের দাবি মেনে নিজের উত্তরসূরি না নেওয়া রাজনৈতিক জীবনের সায়াহ্নে এসে এই অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়েছে শরদ পাওয়ারকে। দিনের পর দিন এনসিপির সর্বময় ক্ষমতা দখল এবং যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজে নিতে গিয়েই দলের ভেতরে অনেকের রোষানলে পড়েছেন তিনি। মেয়ে সুপ্রিয়া সুলেকে দলে কর্র্তৃত্ব দিতে গিয়েই অজিতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে শরদের। 

নিজের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলের সঙ্গে ভাতিজা অজিত পাওয়ারের মধ্যে সঠিক ভারসাম্যও রক্ষা করতে পারেননি তিনি। সুপ্রিয়া সুলেকে দলে কর্র্তৃত্ব দিতে গিয়েই অজিতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে শরদের। বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিয়ার তুলনায় দলে অনেকাংশেই কর্র্তৃত্ব বেশি ছিল অজিতের। আর এই তিক্ততার কারণেই দলত্যাগ করেন অজিত পাওয়ার।

মহারাষ্ট্রে শিবসেনার রাজনৈতিক সঙ্কট শুরু হয় একনাথ শিন্ডের দল থেকে আলাদা হওয়ার সময়ই। দলত্যাগ করার সময় একনাথ শিন্ডে শিবসেনার হিন্দুত্বের চিরাচরিত পথ থেকে সরে যাওয়াকে কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন। আর শরদ পাওয়ার জৌলুস হারিয়েছেন অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। বিধানসভা নির্বাচনে উদ্ধব ঠাকরে ও শরদ পাওয়ারের ভরাডুবি মহারাষ্ট্রের নির্বাচনে দল দুটির অতীত ঐতিহ্য মলিন করেছে অনেকাংশেই। এই ধাক্কা সামলে ভবিষ্যৎ তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন কি না- সেটি বলে দেবে সময়।