রোজকার খরচা জোগানোই কষ্টসাধ্য তাদের

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ শুরু হতে আর কয়েক ঘণ্টা বাকি। অথচ ১০ দলের শীর্ষ লিগে অংশ নিতে যাওয়া তিন দলকে মাঠের চেয়ে বেশি ভাবতে হচ্ছে রোজকার ক্যাম্প খরচা জোগানো নিয়ে। এমনই বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম আবাহনী ও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের সেরা হয়ে শীর্ষ লিগে আসা ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্সকে খেলতে হবে দীর্ঘ ও খরচসাধ্য লিগ। আর্থিক সংকটে যখন অস্তিত্বই বিপন্ন, তখন মাঠে খুব বড় স্বপ্ন নিয়ে নামছে না তারা। কোনো মতে রেলিগেশন এড়াতে পারটাই হবে এদের বড় সাফল্য।

দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পদার্পণের পর থেকেই নিয়মিত বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব চট্টগ্রাম আবাহনী। শিরোপায় চোখ না থাকলেও প্রায় প্রতিবারই একটা ভালো অবস্থানে থেকে লিগ শেষ করে তারা। ২০১৬ সালে রানার্সআপ হওয়া দলটি মাত্র দুটি লিগে খেলতে পারেনি। ২০১২ এবং ২০১২-১৩ মৌসুমে পরের স্তরে খেলার পর ফিরে অবশ্য আর নেমে যেতে হয়নি তাদের। তবে এবার ক্লাবটির আছে অবনমনের ভীষণ শঙ্কা। চরম আর্থিক সংকটে ক্লাবের কর্তাদের প্রতিদিনের ব্যয় জোগানোই দায়।

দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষক সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন হঠাৎ করে সহায়তার হাত সরিয়ে নেওয়ায় দলবদলে অংশগ্রহণই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম আবাহনীর। জাতীয় দলের দুই সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম ও জাহিদ হাসান এমিলি দায়িত্ব নিয়ে শেষ দিনে দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা করতে পারে তারা। যদিও ভালোমানের খেলোয়াড় তারা নিতে পারেনি। একজন বিদেশি খেলোয়াড়কে নেওয়া হলেও এখনো ক্যাম্পে যোগ দেননি তিনি। ক্লাবটির এই দুঃসময়ে নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে দলের কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড সাইফুর রহমান মনি। তার জন্য এই দলকে শীর্ষ লিগে টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। মাত্র পাঁচ সেশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম দিন টানা পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে অসম লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে তার দলকে। মনি বলেন, ‘এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। একদমই ট্রেনিং হয়নি। মাত্র পাঁচটি সেশন কমপ্লিট করেছি। প্রস্তুতির এতটা ঘাটতি নিয়ে প্রথম ম্যাচেই আমাদের নামতে হচ্ছে বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে অসম লড়াইয়ে। এখানে লাভ হলো, আগেভাগেই জানি হারব। তবে ভয়ের দিক হলো, অনেক বড় ব্যবধানে হারলে একটা নেতিবাচক প্রভাব দলে পড়তে পারে। আমাকে আসলে ইন-সিজনেই প্রি-সিজন করাতে হবে। ধরে নিন প্রথম পাঁচ-ছয় রাউন্ড লাগবে দলকে একটা পর্যায়ে আনতে। এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, মাঠের ছক কষা বাদ দিয়ে আমাদের প্রতিদিনের ক্যাম্প খরচ কোত্থেকে আসবে, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। প্রতিদিন খরচ না করলেও ২০ হাজার টাকা লাগছে। বাফুফের নতুন সভাপতির (তাবিথ আউয়াল) বদৌলতে আমরা টিকে আছি। আশিয়ান সিটিকে তিনি বলে দিয়েছেন। তারাই থাকার ও প্র্যাকটিসের সুযোগ দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, নিজের কথা ভাবব কী, কোনোমতে দলটাকে নিয়ে মৌসুমটা শেষ করতে পারাটাই বড় কথা হবে। মোটা দাগে এবার অবনমন এড়ানোটাই আমাদের জন্য বড় সাফল্য।’

বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের শিরোপা জিতে প্রথমবারের মতো পেশাদার লিগে নাম লিখিয়েছিল ফকিরেপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব। তবে রাজনৈতিক পালাবদলে ক্লাবের নেতৃত্বে এসেছে পরিবর্তন। ফলে দল গঠন এবং ভরণপোষণ বড় চ্যালেঞ্জ তাদের জন্য। তারপরও তারা স্থানীয়দের পাশাপাশি পাঁচজন বিদেশিকে স্বাক্ষর করিয়েছে। উজবেকিস্তান থেকে উড়িয়ে এনেছে কোচ লিয়াপিন এলবার্টকে। এই দল নিয়ে তারা চাইছে টিকে থাকতে। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মাঈনু বলেন, ‘আমরা মোটামুটি মানের একটা দল গড়েছি, যাতে টিকে থাকতে পারি। অবনমন এড়াতে পারলেই হলো। এই সমস্যার মধ্যেও আমরা বিদেশি কোচ ও পাঁচ বিদেশি (চার উজবেক ও এক নাইজেরিয়ান) এনেছি। সঙ্গে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের শিরোপাজয়ী পুরো দলটাকেই চেষ্টা করেছি ধরে রাখতে।’ ৩০ নভেম্বর ঢাকা আবাহনীর বিপক্ষে হোম ভেন্যু গাজীপুরের শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে ম্যাচ দিয়ে হবে তাদের পেশাদার লিগের অভিষেক।

এক সময়ের জায়ান্ট ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ১৯ বছর পর ফিরেছে শীর্ষ লিগে। যদিও চরম আর্থিক সংকটে তাদের জন্যও প্রত্যাবর্তনটা সাফল্যের রঙে রাঙানো কঠিন। স্থানীয় হেড কোচ শাহাদাত হোসেনের অধীনে তিন সপ্তাহের কম সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে তাদের পেশাদার লিগে অভিষেক হবে গতবারের রানার্সআপ মোহামেডানের বিপক্ষে লিগের শুরুর দিনে। হোম ভেন্যু গাজীপুরে এই দলটি লিগ শুরু করবে একই টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে। কোচ শাহাদাতের দাবি, স্থানীয় সংগ্রহ খুব একটা খারাপ হয়নি তাদের। তবে বিদেশি মাত্র একজনের সঙ্গে চুক্তি করতে পেরেছে তারা। গত মৌসুমে মোহামেডানে খেলা গাম্বিয়ান সুলেমান সিল্লাহ অবশ্য ঢাকায় থাকলেও এখনো যোগ দেননি ক্লাবের অনুশীলনে। মূলত দেনা-পাওনা নিয়ে বিভেদের কারণেই তিনি যোগ দেননি। শাহাদাত আশা করছেন ক্লাবের নতুন নেতৃত্ব দ্রুতই তাকে দলে যোগ দেওয়ানোর ব্যবস্থা করবেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সারভাইভ করা। প্রস্তুতির সময় কম হয়ে গেছে। তার ওপর শুরুতেই বড় প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে হচ্ছে। আসলে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের নেতৃত্বে পরিবর্তন হয়েছে। আগে যারা ছিলেন, তারা একভাবে চিন্তা করেছিলেন। নতুনদের অন্যভাবে ভাবতে হচ্ছে, কারণ তারা তো বেশি সময়ই পাননি। তাই আর্থিক সংকট নিয়েই আমাদের খেলতে হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম আবাহনীর জন্য এটা অস্তিত্ব রক্ষার লিগ। অনামি স্থানীয়দের নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ কতটা জিততে পারেন মনি, সেটা সময়ই বলে দেবে। মধ্যবর্তী দলবদলের আগে বলাই যায় অবনমনের লড়াইটা তাদের সঙ্গে হবে ধুঁকতে থাকা দুই পুরনোর ক্লাব ফকিরেপুল ও ওয়ান্ডারার্সের।