যে প্রয়াণ প্রত্যাবর্তন

হারুন স্যার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় ওখান থেকে আমার দুটো বই বেরিয়েছিল : একটি ‘টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা’ অন্যটি ‘কথোপকথন’। কেন যেন মনে হয়েছিল ওখান থেকে বই বের হলে একটা মর্যাদা তৈরি হবে। তবে অর্থাগমের সম্ভাবনাও আরেকটা কারণ হয়ে থাকতে পারে। এখন যদিও আর সে রকমটা মনে হয় না। কিন্তু যৌবনের শুরুতে কত কী যে মনে হয়! ওরকমই এক মনে হওয়া থেকে বাংলা একাডেমিতে পান্ডুলিপি জমা দেওয়া। বাংলা একাডেমিতে ইতিমধ্যেই সুব্রত (বড়–য়া) দা এবং ফরহাদ (খান) ভাইয়ের সঙ্গে আগেই পরিচয় হয়েছিল। তাদের আগ্রহ এবং প্রশ্রয়ও আমাকে পান্ডুলিপি জমা দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিল। আমি একাডেমির নিয়মকানুন মোতাবেক টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতার পান্ডুলিপি জমা দিয়ে নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করছি বই আকারে দেখার জন্য। একাডেমি থেকে যাদেরই বই বের হয়েছে তারা জানেন পান্ডুলিপিগুলো রিভিউয়ারদের কাছে যায়, তারা সেগুলো দেখে তাদের মতামত জানান। অনেকেই যেটা জানেন না তাহলো পান্ডুলিপি তারা মাসের পর মাস ফেলে রাখেন আলস্য বা অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে। তাদের কাছে লেখকরাই শুধু নন, ক্ষেত্রবিশেষে একাডেমির কোনো কোনো কর্মকর্তারাও জিম্মি হয়ে যান। এ কারণে অনেকে একাডেমি থেকে বই প্রকাশে অনীহা হয়ে পড়েন। আমার বই দুটো পরে অবশ্য তাদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই বের হয়েছিল।

 

প্রথম বই বের হওয়ার পর কবি বন্ধু সরকার আমিন আমাকে হারুন স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমিন ছিলেন হারুন স্যারের অত্যন্ত স্নেহভাজন, তদুপরি, একাডেমির একজন কর্মকর্তা। ফলে আমিনের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ায় একটু হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়েছিলাম।  আমি বয়সে তার সন্তানতুল্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে লেখকের যথাযথ মর্যাদায় গ্রহণ ও আপ্যায়ন করলেন তার অফিসকক্ষে। বললেন, ‘তুমি টেড হিউজ অনুবাদ করেছ! আমাদের শিক্ষকরাই তো তাকে অনুবাদ করার সাহস করেন না।’ আমি বললাম, ‘স্যার, সেই যে একটা প্রবাদ আছে :  Fools rush in where angels fear to tread...আমি তাদেরই একজন।’ স্যার প্রতিবাদ করে বললেন, ‘তোমার অনুবাদ খুব ভালো হয়েছে, সেজন্য বাংলা একাডেমি থেকে বেরুতে পারল। তোমাকে অভিনন্দন।’ এই হলেন হারুন স্যার। এরপর আমার দ্বিতীয় বইটিও বেরুলো প্রায় বাধাবিঘœহীনভাবেই। এবং বলাই বাহুল্য, হারুন স্যারের কারণেই বোধহয় দ্রুতগতিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর হারুন স্যারের সঙ্গে কদাচিৎ দেখা হয়েছে। অনেক পরে, বাংলাবাজার পত্রিকায় হারুন স্যারের পীরের সঙ্গে তার কথোপকথন ধারাবাহিক প্রকাশের সূত্রে তার সঙ্গে আবার যোগাযোগ এবং হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। স্যার সমসময়ই অমায়িক, আলাপি আর সৌজন্য স্নিগ্ধ। কথা উচ্চৈঃস্বরে বলেন না, কিন্তু যা বলেন তা সারবান। আমি তার লেখার ভক্ত ছিলাম তার সঙ্গে পরিচয়েরও আগে থেকে। সাক্ষাতে তাকে সে কথা বলেওছিলাম। তিনটি ফরাসি প্রবন্ধ নামে একটা অসাধারণ সংকলন বেরিয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে। ওটায় সাঁৎ ভব, আঁদ্রে জিদ আর কার যেন একটা প্রবন্ধ ছিল। তিনটি প্রবন্ধই ছিল যাকে বলে ক্লাসিক। হারুন স্যার যে খুব যতœ নিয়ে অনুবাদ করেছিলেন তার প্রমাণ এর ভাষাভঙ্গি আর স্বচ্ছতায়। তার অনুবাদে এসআই হায়াকাওয়ার ভাষা চিন্তায় ও কর্মে  (Language in Thought and Action) এবং জাঁ পল সার্ত্রে-এর মাছি নাটকটি যারা পড়েছেন তারা জানেন তিনি অনুবাদকর্মকে এক শিল্পকর্মে উত্তীর্ণ করেছেন।

তিনি শেষ জীবনে সুফিবাদ বা সুফি দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, সুফি সাধক সৈয়দ রশীদ আহমদ জৌনপুরী হারুন স্যারের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন। কথাটা মিথ্যা নয়। সাধক জৌনপুরীর সংলাপ, তাকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থসহ একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তিনি। সন্ধান করেছিলেন কিংবা খুঁজে পেয়েছিলেন ধর্মের মধ্যে নান্দনিকতা। আমি অবশ্য ধর্ম সম্পর্কে নিরতিশয় নিরাগ্রহী, ফলে হারুন স্যারের এসবে আমার উৎসাহ কম ছিল, কিন্তু তাই বলে এ কারণে তার প্রতি শ্রদ্ধার ঘাটতি হয়নি কখনো। আমি সবসময়ই

কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি তার ঔদার্য ও প্রশ্রয়কে, যা প্রবীণরা কদাচিৎ নবীনদের ক্ষেত্রে করে থাকেন। আর যদি সেই প্রবীণ হন ক্ষমতাবান কেউ তাহলে অপ্রাপ্য অনেক উপেক্ষা ছুড়ে মারেন নবীনদের প্রতি। হারুন স্যার ছিলেন আমার ক্ষেত্রে, আরও কারও কারও ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই, এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তার হৃদয়টা ছিল উদার প্রকৃতির। ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুন্দর এক মানুষ। আদর্শনিষ্ঠ এবং কর্মবীর; তার স্বভাবে ছিল নেতৃত্ব দেওয়ার এক বিরল গুণ। সততা ও বিদ্যার এমন এক সৌন্দর্য তার চরিত্রের মধ্যে ছিল, যা তাকে একদিকে করেছে মানবিক, অন্যদিকে তার ব্যক্তিত্বকে করেছে পরিশীলিত।

প্রিয় মানুষটির সঙ্গে অনেক দিন আর দেখা হয়নি, কারণ বিদেশ বিভুঁই। দেশে ফেরার পর, কয়েক বছর পরই বলা যায়, স্যারের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে দেখা হতেই কথা প্রসঙ্গে জানালেন আমার সেই বই প্রকাশের পেছনে এক আচ্ছাদিত ঘটনা। কী সেই ঘটনা? আমি কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। ‘তুমি বোধহয় জান, আমাদের পান্ডুলিপির বেশিরভাগ রিভিউয়ারই হচ্ছেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তোমার পান্ডুলিপি এক শিক্ষক আটকে দিয়েছিলেন। পরে আমি অন্য এক যিনি তার চেয়েও অনেক বেশি যোগ্য শিক্ষকের কাছে পাঠাতে বলেছি পান্ডুলিপিটি। যদি ভুল থাকে তাহলে যেন যথাযথ পরামর্শ দেওয়া হয় পান্ডুলিপি সংশোধনের জন্য। তিনি ছোটখাটো দু-একটি পরামর্শ দিয়ে পান্ডুলিপিটি প্রকাশের অভিমত জানিয়েছিলেন। বুঝলে, তোমার মতো অজ্ঞাতকুলশীল টেড হিউজের কবিতা অনুবাদ করেছে এটা সেই শিক্ষক মানতে পারেননি।’  আমি অবাকই হয়েছিলাম স্যারের মুখে এই ঘটনা শুনে। তলে তলে যে এত কিছু ঘটে গেছে তা স্যার না বললে কোনোদিনই জানা হতো না। কিন্তু স্যার ওসব বাধায় দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। বইটি অল্প সময়ের মধ্যেই বের হয়েছিল। সেই তখনই শুনেছি কারও কারোর পান্ডুলিপি পড়ে থাকে, বছরের পর বছর গড়িয়ে যায় কিন্তু পান্ডুলিপি আর বই হয়ে বের হয় না। এখন ভাবি, ওই বয়সে আমার ভাগ্য কতই না সুপ্রসন্ন ছিল হারুনের স্যারের হস্তক্ষেপ ও আনুকূল্যের কারণে। এমনকি বইটি যখন প্রকাশিত হলো তিনি ওই বইয়ের ওপর একুশের অনুষ্ঠানমালায় আলোচনারও ব্যবস্থা করেছিলেন, তাতে সভাপতি ছিলেন কবি মনজুরে মওলা। আলোচক ছিলেন কবি মাহবুব সাদিক, ফেরদৌস আজিম প্রমুখ। আলোচকদের কেউ কেউ আমার অনুবাদ নিয়ে সমালোচনা করলেও, সভাপতি মনজুরে মওলা প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

এটা ঠিক যে, স্যার আমার প্রতি কোনো অন্যায় আনুকূল্য দেখাননি; কিন্তু আমার প্রতি অপরের অন্যায় রোধ করেছিলেন বলেই আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে আছি। আমার দ্বিতীয় বইটিও রিভিউয়ারের চোখ রাঙানি পার হয়ে তবেই সেটি প্রকাশিত হতে পেরেছিল। অবাক হয়েছিলাম জেনে যে, এই দ্বিতীয় বইটির রিভিউয়ারের নাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার রিভিউটি যখন দেখলাম তখন মন খারাপ হয়েছিল অনুবাদ নিয়ে তার সমালোচনা দেখে। কিন্তু পরক্ষণেই খুশি হয়েছিলাম তার বিকল্প প্রস্তাবটি দেখে। সত্যি বলতে কী, অনুবাদের জগতে আমার যদি একজন সত্যিকারের দিশারি থেকে থাকেন, তা হলে তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার কাছ থেকে অনুবাদের কলাকৌশল আমি শিখেছি; আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই শিক্ষা ছিল পরোক্ষে এবং তারই অজান্তে। এর জন্যও আমি হারুন স্যারের তত্ত্বাবধানকেই কৃতিত্ব দেব।

হারুন স্যারের সঙ্গে যখনই দেখা হতো, আমার কথা তো জানতে চাইতেনই, আমার স্ত্রীর খোঁজখবরও নিতেন। বলতেন, বিদেশি স্ত্রীর যতœ নেবে। তাকে কখনই মনে কষ্ট দিও না। সে কিন্তু এখন তোমার শুধু স্ত্রীই নয়, তোমার মেহমানও। তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন দেখে যে আমার স্ত্রী বাংলা ভাষাটি কথা চালাবার মতো করে শিখে ফেলেছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘বিদেশ থেকে তুমি এক বাঙালি বউ নিয়ে এসেছ।’ আসলে ঘটনা হলো ও এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশতে চেয়েছে যাতে করে ওকে কেউ আলাদা করে না দেখে। আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে ও সফল। অন্তত স্যারের স্বীকৃতি সে কথাই বলে।

ভাষার ব্যাপারে স্যারের কৌতূহলের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ২০১৪ সাল, কথাসাহিত্যিক গার্সিয়া এ বছরই মারা যান। কাদের আয়োজনে যেন মার্কেসকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে আলোচক ছিলেন কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন, মুহম্মদ নূরুল হুদা, আমি। সেদিন বউসহ ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম পাঠক সমাবেশে। আলোচক হিসেবে আর কেউ ছিলেন কিনা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। মাসরুর খুব চমৎকার বলেছিলেন সেদিন মার্কেসকে নিয়ে। স্যার সম্ভবত দর্শক সারির একেবারে সামনেই বসে আছেন। মার্কেস সম্পর্কে আমাদের কথাবার্তা শোনার জন্য। আমার বক্তৃতা শেষ হতেই স্যার আবদার করে বসলেন, আমার বউ যেন মার্কেসের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা থেকে একটু পড়ে শোনায়। আমি বললাম, ‘স্যার, স্প্যানিশ তো এখানে কেউ বুঝবে না। কী হবে শুধু স্প্যানিশে পড়ে!’ স্যার নাছোড়বান্দা, বললেন, ‘আরে, পড়তে দাও না, মূলে এটি কেমন শুনায় সেটা একটু শুনি।’ আমার বউ তার আহ্বানে মূল বইটি থেকে এক পৃষ্ঠা পাঠ করে শোনালেন। স্যার, খুব খুশি হয়েছেন স্প্যানিশ পাঠ শুনে। বউকে ধন্যবাদ জানালেন তার স্বভাবসুলভ সৌজন্য বোধ থেকে। স্যারের এই শিশুতোষ কৌতূহল আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষার ব্যাপারে তার মনোযোগ ও দরদের বিষয়টি। ভাষা ও সাহিত্য এই দুটো ছিল তার দুই ডানা। মৃত্যু তার এই দুই ডানাকে স্থবির করে দিয়েছে। হরণ করেছে তার চাঞ্চল্য। মৃত্যুর কথা তিনি জানতেন, বলা যায় খুবই সচেতন ছিলেন। মৃত্যুর দরজা ছুঁয়েও এসেছিলেন একবার। তবে সেবার মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরিতে তিনি জিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার মৃত্যুই জিতে গেল। তবে মৃত্যু হয়তো তার নিছক শরীরটা নিয়ে যাবে, কিন্তু স্যারের হৃদয়ছোঁয়া মানবিক গুণাবলি, তার মননশীল কাজের ভাণ্ডার, তার সততায় মোড়ানো যে আদর্শনিষ্ঠ জীবন ছিল, তা আমাদের জীবনে উজ্জ্বল উপস্থিতি হিসেবে থেকে যাবে। এমন মানুষের প্রয়াণ আসলে অন্য এক প্রত্যাবর্তন। মৃত্যু যেন তাকে জীবিত করে তুলল। জীবদ্দশায় আমরা তার যেসব উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করেছি, এখন আমরা সেই আদিম মানুষের শিকার শেষে গনগনে আগুনকে ঘিরে বসে থাকা মানুষের মতো তার কৃতিকে ঘিরে মূল্যায়ন শুরু করব। তার আগুনের আঁচে আমাদের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করব।  তাকে আমার গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

razualauddin@gmail.com