সম্প্রীতি মানে সবার সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করা। সদ্ভাব বজায় রেখে মিলেমিশে চলা। প্রতিটি দেশে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। যেকোনো দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তাই সমানভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চর্চা করা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আবশ্যক। একটি দেশে বসবাসরত নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যকার আন্তরিকতা, ঐক্য, সংহতি ও সহযোগিতার মনোভাবই হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জোর তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। যা ইসলামের মহান শিক্ষা। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার অনেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবুও কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল যুগে যুগে এ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের পাঁয়তারা করেছে।
মানুষ হিসেবে হিন্দু-মুসলিম সবাই এক জাতিভুক্ত। সব মানুষই এক আল্লাহর সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘সব মানুষ ছিল একই জাতিভুক্ত। অতঃপর মহান আল্লাহ পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২১৩) তাই সৃষ্টিগতভাবে সমগ্র মানবগোষ্ঠী বিশ^ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো।’ (সুরা হুজুরত, আয়াত ১৩) হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সব মানুষই আদিপিতা হজরত আদম (আ.)-এর বংশধর।’ (জামে তিরমিজি)
উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, মানুষ হিসেবে মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বরং সবাই আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর বংশধর। তাই হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা সবার কাম্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা ইসলামের অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য। আমাদের সমাজে দেখা যায়, ধর্ম ভিন্ন হলেও হিন্দু-মুসলিম একে অপরের সহপাঠী, সহকর্মী, খেলার সঙ্গী, শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজন। প্রত্যেকের উচিত পরস্পরের সঙ্গে সবসময় ভালো ব্যবহার করা এবং কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ না করা। সাম্প্রদায়িকতার নামে যারা বিশৃঙ্খলা করে তাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, যারা সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে এবং সাম্প্রদায়িকতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে তারা আমাদের সমাজভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ)। যারা না জেনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করছে তাদের জন্য উচিত হলো, এমন গর্হিত কাজের শেষ পরিণতি কী হবে, সে সম্পর্কে একটু চিন্তা-ভাবনা করা। আর যারা জেনে বুঝেই এমন গর্হিত কাজে নিয়োজিত হচ্ছে তাদের বিষয়ে কথা হলো ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত করা যায়, জাগ্রত ব্যক্তিকে নয়। তাদের জন্য প্রচলিত আইনে কঠিন শাস্তি প্রদান কাম্য।
প্রকৃত মুসলমান ওই ব্যক্তি যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট থেকে লোকজন নিরাপদ থাকে এবং যার নির্যাতন থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে তাকে মুমিন বলা হয়। একবার হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে এক ইহুদি মেহমান হয়ে এলো। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যথাযথ মেহমানদারি করলেন এবং রাতে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলেন। ইহুদি মেহমান অসুস্থতাবশত বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু বলবেন এই ভয়ে সে সকালের আগেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়। ভোরে ওই ময়লাযুক্ত বিছানা দেখে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন যে, হায়! আমি ওই ব্যক্তিকে যথাযথ মেহমানদারি করতে পারিনি। হয়তো সে কষ্ট পেয়েছে। অতঃপর হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত বিছানা পরিষ্কার করলেন এবং ওই ব্যক্তির কাছে গিয়ে এভাবে ক্ষমা চাইলেন, ভাই! আপনার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে। আমি আপনার কোনো যতœ করতে পারিনি। এ জন্য আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন ইহুদি লোকটি বলল, অপরাধ করলাম আমি আর ক্ষমা চাচ্ছেন আপনি। ইসলামের আদর্শ তো সত্যিই মহৎ! অতঃপর হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এমন উদারতা ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরূপ উৎকৃষ্টতম আদর্শের মাধ্যমেই বিশ^ব্যাপী ইসলামের প্রচার ও জাগরণ ঘটেছে।
এ রকম নানা ঘটনার মাধ্যমে ইসলাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। যদিও এ দেশের সমাজ কাঠামোতে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশেই আছেন হাজার বছর ধরে; তবুও সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সর্বশেষ পতিত সরকার পর্যন্ত প্রায় সব শাসক গোষ্ঠীই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য নানাভাবে এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করেছে। সাম্প্রতিক সময়েও সেই চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে নানা মাধ্যমে আলোচনা চলছে। কিছু দেশের দিকে তাকালেই দেখা যায়, সেখানে সংখ্যালঘুরা কত কঠিনভাবে নিগৃহীত হয়। তারা অপরের কাছ থেকে প্রীতির প্রত্যাশা করে কিন্তু নিজেরা প্রীতির চর্চায় সেই জাহেলিয়াতের বৈশিষ্ট্য এখনো ধরে রেখেছে। এমন মনোভাব থাকলে তো সম্প্রীতির চর্চা হয় না। উগ্রতা পরিহার করতে হবে। ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি উদার হতে হবে। তাহলে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পর প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য যেভাবে চক্রান্ত করে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যেন চক্রান্ত ভ-ুল করে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সম্প্রীতির একটি দেশ গড়তে পারি।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
atikr7280@gmail.com