আবু সাঈদের মতো বুক পেতে দেন সজল

নাম রিয়াজুল ফরাজী (৩৮)। ৪ জনের টানাটানির সংসার। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ছুটতেন স্যানিটারির কাজে, যা আয় হতো তা দিয়েই চলত পরিবার। হাতে কাজ না থাকলে বের হতেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতে। রংমিস্ত্রির কাজ বেছে নিয়েছিলেন সজল মোল্লা (৩০)। আর মিশুক চালিয়ে নানির হাতে প্রতিদিনের রোজগারের টাকা তুলে দিতেন নুর মোহাম্মদ ওরফে ডিপজল সরদার (১৯)। এভাবেই চলছিল ওই তিন দিনমজুর-শ্রমিকের সংসার। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন তারা। মুন্সীগঞ্জ শহরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়ে নিহত ডিপজল, সজল ও রিয়াজুল এখন রক্তে লেখা নাম। তাদের সবার বাড়ি শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকায়।

দিনটি ছিল ৪ আগস্ট। সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন। সকাল ১০টার দিকে শহরের থানারপুল চত্বর থেকে পিটিআই মোড় পর্যন্ত এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছিল সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। রংপুরের আবু সাঈদের মতোই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেন দিনমজুর সজল। বুকে ও পেটে এসে লাগে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছোড়া বেশ কয়েকটি গুলি। মুহূর্তে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরপরই গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন দিনমজুর রিয়াজুল, ডিপজলসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে গুলিবিদ্ধ রিয়াজুল ও ডিপজলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। আর গুলিবিদ্ধ সজলকে জেলার সিরাজদীখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত ঘোষণা করেন সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক।

রিয়াজুল ফরাজী শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকার প্রয়াত কাজী মতিন ফরাজীর ছেলে। দুই মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ধারদেনা করে। ছোট মেয়ে পড়ছে দশম শ্রেণিতে। একমাত্র উপার্জনক্ষম রিয়াজুলের চলে যাওয়া কোনো মতেই মেনে নিতে পারছেন না স্ত্রী ও মেয়েরা। বাবার কথা যখনই মনে পড়ে, তখনই কেঁদে ওঠে ছোট মেয়ে খুকু আক্তার। তাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা নেই কারও।

বিলাপ করতে করতে রিয়াজুলের স্ত্রী রুমা আক্তার বলেন, ‘তোমারে বাইরে যাইতে মানা করছিলাম। তখন বলেছিলা জলদি ফিরা আইবা। তুমি তো আর ফিরা আইলা না। আমরা কই যামু, কি করমু, কে আমাগো দেখব।’

উত্তর ইসলামপুরের আলী আকবর মোল্লার দুই ছেলে সজল মোল্লা ও সাইফুল মোল্লা অংশ নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। দুই ভাই-ই ছিলেন অগ্রভাগে। দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেন বড় ভাই সজল। আর তখনই ছোট ভাই সাইফুলের চোখের সামনে বুকে আর পেটে গুলিবিদ্ধ হন বড় ভাই। ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। সাইফুল মোল্লা বলেন, ‘বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ই সজল বলে গিয়েছিল সরকার পতন করে লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়েই বাড়ি ফিরবে। নয়তো শহীদ হয়ে ফিরবে। আমার ভাই সরকারের পতন দেখে যেতে পারেনি। তবে কথা রেখেছে। লাশ হয়ে বীরের বেশে বাড়িতে ফিরেছে।’

ছেলেকে হারানোর বেদনায় মুষড়ে আছেন বাবা আলী আকবর মোল্লা। তিনি বলেন, ‘হোক দুনিয়ায়, নয় তো পরকালে হলেও ছেলে হত্যার বিচার চাই।’

নিহত নুর মোহাম্মদ ওরফে ডিপজল সরদার শরীয়তপুরের নড়িয়ার সিরাজুল সরদারের ছেলে। উত্তর ইসলামপুর এলাকায় নানী শেফালীর কাছে বড় হতে থাকে ডিপজলরা দুই ভাই ও দুই বোন। নানির সংসার চালাতে বেছে নেয় মিশুক চালানোর কাজ। ডিপজলের মা রুমা খাতুন বলেন, ‘মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে ফোন কইরা পোলাডা কইছিল মাগো তোমার আর ঢাকা থাকতে লাগব না। খুব তাড়াতাড়ি লইয়া আইব। যত ধারদেনা আছে সব কাজ কইরা শোধ করব। সবাইরে লইয়া একসাথে এক বাড়িতে থাকব। আমার পোলাডার সঙ্গে থাকা অইল না। গুলি কাইর‌্যা নিল পোলাডারে।’

সজল মোল্লা নিহতের ঘটনায় তার ছোট ভাই সাইফুল মোল্লা গত ২০ সেপ্টেম্বর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়সাল বিপ্লবসহ ৪৫১ জনকে আসামি করে মুন্সীগঞ্জ সদর হত্যা মামলা করেন। এর আগে ২০ আগস্ট রিয়াজুল ফরাজীর স্ত্রী রুমা আক্তার ও ৩০ আগস্ট নুর মোহাম্মদ ওরফে ডিপজলের নানি শেফালি বেগম একই থানায় হত্যা মামলা করেন।