ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ইরান। দেশটি তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে ৬ হাজারের বেশি নতুন সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কাছে এরইমধ্যে নিজেদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে তেহরান। বৃহস্পতিবার সংস্থাটির একটি গোপন প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আইএইএর প্রতিবেদনে ইরানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থাটির ৩৫টি দেশের বোর্ড অব গভর্নরদের পাস করা একটি প্রস্তাবের জবাবে ইরান এই ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিবেদনে নতুন সেন্ট্রিফিউজগুলোর জন্য নির্দিষ্ট মাত্রায় ৫ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এটি ৬০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানোর মানে হলো ইরান আরও দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজেদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে। এতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্য অস্বীকার করলেও ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো বলছে, কেন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, তার ব্যাখ্যা দেয়নি ইরান। পারমাণবিক বোমা তৈরি করা ছাড়া কোনো দেশ এ মানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে না। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ পরিশুদ্ধতা প্রয়োজন হয়। তবে নতুন সেন্ট্রিফিউজের ক্ষেত্রে ইরান ৫ শতাংশ পরিশুদ্ধতার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের আগেই পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে ইরান। তাই বিশুদ্ধতা কম হওয়ার বিষয়টিকে ইরানের সমঝোতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে নাতানজ ও ফোর্দোতে দুটি ভূগর্ভস্থ এবং নাতানজের একটি ভূপৃষ্ঠস্থ পরীক্ষামূলক কেন্দ্রে ১০ হাজারের বেশি সেন্ট্রিফিউজ পরিচালনা করছে তেহরান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান ১৬০টির বেশি মেশিন নিয়ে গঠিত ৩২টি নতুন ক্যাসকেড স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। সেই সঙ্গে ১ হাজার ১৫২টি উন্নত আইআর-সিক্স মেশিন নিয়ে আরেকটি বিশাল ক্যাসকেড তৈরি করবে।
ফোর্দো পারমাণবিক কেন্দ্র একটি পাহাড়ের মধ্যে নির্মিত হওয়ায় এই কেন্দ্রটি নিয়ে বাড়তি সতর্ক অবস্থানে আছে সংস্থাটি। দেশটির ভূগর্ভস্থ দুটি পারমাণবিক কেন্দ্রেই ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চলছে। এদিকে, ইরানের এই ঘোষণার পর দেশটিকে আবারও হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১৪-কে নেতানিয়াহু বলেন, তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া ঠেকাতে সবকিছু করবে তার দেশ। তিনি বলেন, আর সেটি করতে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী একমাত্র দেশ ইসরায়েল। যদিও তারা তা স্বীকার করে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যাতে এ অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলোর একটি। হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতার পাশাপাশি ইরানি জেনারেলকে হত্যার জের ধরে চলতি বছর তেল আবিব-তেহরানের মধ্যে দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির চুক্তি হয়। নিজেদের কার্যক্রমকে পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের পর্যায়ে উন্নীত না করে সীমিত রাখার শর্তে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল চুক্তিটিতে। তবে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিটি থেকে সরিয়ে নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।