ভোলার ছেলে ইফতেখার হোসেন ইফতি। এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগে বরিশাল বিভাগের হয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। সেরা ৫ রান সংগ্রাহকদের একজন তিনি। যার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটা আর দশজনের চেয়ে একটু আলাদা। সেটাই শুনিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানের কাছে...
প্রশ্ন : এই বছরের জাতীয় লিগে আপনার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বেশ ভালো, তবে আপনার দল বরিশাল পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে। বাকিদের আরেকটু সমর্থন পেলে কি ব্যাটিংটা আরও ভালো হতো?
ইফতেখার হোসেন ইফতি : অবশ্যই, সতীর্থদের কাছ থেকে যদি আরেকটু সহায়তা পেতাম তাহলে ব্যক্তিগত রান যা হয়েছে তার চেয়ে আরেকটু ভালো হতো, দলের ফলও ভালো হতো। আমাদের দলের প্রথম ইনিংসটা ভালো হয়েছে, দ্বিতীয় ইনিংসে এসে আমাদের জানি না কী হয়, সবাই ফ্লপ করে। দ্বিতীয় ইনিংসে যদি ব্যাটিংটা ভালো হতো আর অন্যরাও যদি একটু রান করত তাহলে দল হিসেবে আমাদের অনেক ভালো হতো, নিজেও ব্যাটিংয়ে আরেকটু আত্মবিশ্বাস পেতাম। যখন দেখি অন্যরাও খারাপ করছে তখন নিজের ভেতরও দ্বিধা কাজ করে। অনেক সময় শুরুতেই চার-পাঁচটা উইকেট পড়লেও আমাকে থাকতে হয় উইকেটে, তখন মারার বল পেলেও ডিফেন্স করতে হয়। অন্তত দলের একটু সাপোর্ট পেলে আমার আরেকটু ভালো পারফরম্যান্স হতো।
প্রশ্ন : এবার তো জাতীয় ক্রিকেট লিগে তৃতীয় মৌসুম আপনার, বিগত দুটো মৌসুম কেমন কেটেছিল? এবারের মৌসুমটা কেন স্পেশাল?
ইফতি : আমার অভিষেক হয় ২০২২ সালে, তখন আমাকে মৌসুমের শেষ দুইটা ম্যাচে একাদশে রেখেছিল। তখন লাল বলে আমি খুব একটা অভ্যস্ত ছিলাম না, আমি অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ছিলাম, সেখানে সবসময় সাদা বলেই খেলা হতো। আমি লাল বলের সঙ্গে খুব একটা মানিয়ে নিতে পারিনি। পরের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ এর মৌসুমে আমি ৫টা ম্যাচ খেলেছিলাম। আমি সব ইনিংসেই প্রায় ৩০-৪০ রান করেছিলাম, একটা মাত্র মনে হয় হাফসেঞ্চুরি ছিল। আমি বারবার সেট হয়ে আউট হয়ে যেতাম, ইনিংস বড় হতো না। পরে এটা নিয়ে আমি কাজ করেছি কোচদের সঙ্গে। অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ওরা কিছু পরামর্শ দিয়েছে, কিছু কাজ দিয়েছে। আমি সেগুলো অনুসরণ করে প্রস্তুতি নিয়ে এবার অনেকটাই সফল হয়েছি।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের যেসব এলাকায় ক্রিকেট নিয়মিত আয়োজন হয় যেমন সিলেট, খুলনা, রাজশাহী; বরিশাল ঠিক তেমন নয়। সেখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয় না, জাতীয় দলে বরিশালের ক্রিকেটারও প্রায় নেই বললেই চলে। এতে কী সমস্যা হয়?
ইফতি : আমি মনে করি বিভাগীয় দলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা থাকলে আমাদের জন্য সুবিধা, আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি তাদের কাছ থেকে। তাদের সঙ্গে খেললে, তাদের অভিজ্ঞতা জানতে পারলে আমাদের জন্য ভালো হতো। বরিশালে অনেক দিন ধরে লিগ হয় না, খেলা হয় না, বরিশাল তাই দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। অন্য সব বিভাগেই দেখবেন জাতীয় দলে খেলা অনেকেই আছে, বরিশালে হাতেগোনা কয়েকজন। এখন শুধু তানভীর ভাই আছে, তাও আসা-যাওয়ার ভেতরে নিয়মিত না। উনিও টি-টোয়েন্টির প্লেয়ার। বরিশালে ৭-৮ বছর ধরে কোনো লিগ হয় না। এ রকম হলে ভালো ক্রিকেটার পাওয়া কঠিন।
প্রশ্ন : আপনার জন্ম হচ্ছে ভোলা জেলায়, দ্বীপ অঞ্চল থেকে ক্রিকেটার হওয়ার গল্পটা একটু শুনি?
ইফতি : আমি আগে ক্রিকেট খেলতাম না, পড়াশোনাই করতাম। আমার বাবা ও মা বিশেষ করে বাবা ক্রিকেট খুব পছন্দ করেন। আমি এলাকায় টেপ টেনিস খেলতাম। আমার আব্বু একদিন আমাকে বলল যেÑ ‘তোর তো ক্রিকেটে অনেক উৎসাহ, তোরে ঢাকায় ক্রিকেটে নিয়ে ভর্তি করে দিই, তুই খেল।’ তখন আমি এসএসসি দেব, তার ৬-৭ মাস আগে আমাকে ঢাকায় এনে ধানমন্ডি ক্লাবের অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দেয়। এরপর সেখানে ১ বছর অনুশীলনের পর ভোলা থেকে জাতীয় বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার ট্রায়াল দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ এর ক্যাম্পের জন্য নির্বাচিত হই।
প্রশ্ন : এসএসসি পরীক্ষার আগে সবাই তো ভালো ফলের জন্য পড়ালেখার কোচিংয়ে ভর্তি হয়, আপনি ক্রিকেটের কোচিং শুরু করলেন?
ইফতি : আমাদের পরিবারে আসলে পড়ালেখা নিয়ে কোনো চাপ নেই। আমার বাবা এইসব পছন্দ করেন না, আমরা ৩ ভাই। আমার আব্বু বলেছেন আমাদের জন্য যেটা পছন্দ সেটা যেন বেছে নিই। আমার ভাই প্রকৌশলী হতে চেয়েছে, তাকে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করে দিয়েছে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে খেলতে ভালো লাগে কি না, আমি বলেছি ভালো লাগে, আমাকে তাই খেলায় ভর্তি করে দিয়েছে। আসলে উনি মনে করেন একেক জনের একেক দিকে প্রতিভা থাকতে পারে, তাই কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেন না।
প্রশ্ন : ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হলে, ট্রায়ালে সিলেক্ট হলে, এরপর?
ইফতি : ভোলা থেকে সিলেক্ট হওয়ার পর আমাদের খেলা পড়ে সাতক্ষীরার সঙ্গে, সেই ম্যাচটা আমরা জিতি আর আমি বিভাগীয় দলের ক্যাম্পের জন্য নির্বাচিত হই, অনূর্ধ্ব ১৮-তে। এরপর আমি বরিশাল বিভাগের হয়ে খেলেছি, আমি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলাম। এরপর ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ডাক পাই, সেখানে ৫ রানের জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হই, সেখান থেকে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে ডাক পাই (২০২২-এর বিশ্বকাপের ব্যাচ)। আমি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে মোটামুটি সব সিরিজই খেলেছি, দেশে এবং বিদেশে। এশিয়া কাপে খেলেছি, বিশ্বকাপে খেলেছি। আমি চারটা ম্যাচে খেলেছিলাম বিশ্বকাপে, আমাদের দলটা ভালো ছিল কিন্তু বিশ্বকাপে ভালো করতে পারিনি। আমি প্রায় ৪০ গড়ে রান করেছিলাম। এরপরের বছর এনসিএলে ২ ম্যাচে খেলার সুযোগ পাই।
প্রশ্ন : অনূর্ধ্ব ১৯ দল, এর পর তো বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে হাই পারফরম্যান্স ইউনিটে রাখা হয়, আপনার সুযোগ হয়নি?
ইফতি : না, আমরা ভালো ফল না করায় আমাদের দলের বেশিরভাগ বোলারকে এইচপিতে রাখে, ব্যাটসম্যানদের কাউকেই সে রকম ভাবে এইচপিতে রাখেনি। এখন এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়নদের এইচপিতে রেখেছে, আমাদের রেজাল্ট ভালো হয়নি তাই রাখেনি।
প্রশ্ন : যুবদলের পর যখন এইচপিতে জায়গা হলো না, তখন অনুশীলনের মনোযোগ, কোচিং, চর্চা, এসব নিয়ে কি সমস্যায় পড়েছিলেন? সেই সময়টায় কারা সহায়তা করেছে?
ইফতি : এরপর ধানম-ি অ্যাকাডেমিতেই অনুশীলন করতাম। আমার বন্ধুরা যারা ভালো করেছিল, এইচপিতে সুযোগ পেয়েছিল, আমি পাইনি। এই নিয়ে আমার একটা জেদ ছিল, যে আমি আমার কাজটা করে দেখাব। আল্লাহ চাইলে উনি অবশ্যই দেবেন। এই সময় ধানম-ি ক্লাবের সুনান রাবিয়াত, ম্যাক্স নামেই সবাই উনাকে চেনে, উনি অনেক হেল্প করেছেন। সেলিম স্যার, সোহেল স্যার (সোহেল ইসলাম)-সহ যারা আসতেন সবার কাছ থেকেই টিপস নিয়েছি। নিজের কাজটা নিজেই করতাম, উনাদের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতাম।
প্রশ্ন : গত মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন গাজী টায়ার অ্যাকাডেমির হয়ে। প্রিমিয়ারে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন?
ইফতি : এবারই প্রথম প্রিমিয়ার লিগে খেললাম, এর আগে প্রথম বিভাগে খেলেছি ২ মৌসুম। আমাকে প্রিমিয়ারের জন্য সই করালেও প্রথম বিভাগে খেলিয়েছে বেশি। আমি প্রথম বিভাগে গত বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলাম। দুই বছরই আমার রান ১৩০০-এর কাছাকাছি ছিল, দুই বছরই আমি ভালো করেছি। পরে প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগে খেললাম।