দুর্ঘটনার ১৭.৯১ শতাংশ ব্যাটারিযানে

ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের আদেশের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত। আর এই সুযোগে নতুন করে রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। চলাচলে এখনো কোনো নীতিমালা ঠিক না হওয়ায় হযবরল অবস্থা চলছে এই যানটি ঘিরে। অন্যদিকে হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থার পর গ্যারেজগুলোতে নতুন ব্যাটারিচালিত রিকশা বানানোর সংখ্যা বেড়েছে।

যদিও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১৫ বছর ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তৎকালীন সরকার। সেজন্য রাজধানীতে অবৈধ এই যানের সংখ্যা বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। তাই এর দায় শুধু যে চালকদের তা নয়। এর দায় সে সময়ের নীতিনির্ধারকদেরও আছে। তবে এখন দ্রুত একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন এই ব্যাটারিচালিত যানের জন্য।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়া ৬৩১টি যানবাহন শনাক্ত হয়েছে। এতে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া যানবাহনের মধ্যে ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাস এবং ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। সেই হিসাবে দুর্ঘটনার দিক থেকে চতুর্থ অবস্থায় আছে এই ব্যাটারিচালিত রিকশা।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো দাপটের সঙ্গে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এমনকি কিছু কিছু জায়গায় প্রধান সড়কেও উঠে যাচ্ছেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। বেপরোয়া চালকদের জন্য হিমশিম খেতে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের।

সম্প্রতি মগবাজার এলাকায় একটি অটোরিকশার সঙ্গে ধাক্কা লেগে মোটরসাইকেল আরোহীকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী মাজহার ইমন বলেন, ‘বেপরোয়া অটোরিকশা মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। গতি বেশি থাকায় রিকশাচালক ব্রেক ধরেও কোনো লাভ হয়নি। এই অটোরিকশাগুলোকে মনিটরিংয়ে না আনলে সামনে আরও সমস্যায় পড়তে হবে।’

রাজধানীর জুরাইন এলাকার এক অটোরিকশাচালক হাকিম মিয়া বলেন, ‘জুরাইনের অলিগলির অবস্থা খুব খারাপ। আর কয়দিন পর পর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির জন্য অলিগলি দিয়ে রিকশা চালানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সময় প্রধান সড়কে দিয়ে চালাতে হয়। সরকারের উচিত অলিগলির রাস্তাঘাটও ঠিক করা। যেন ভালোভাবে সব জায়গায় আমরা রিকশা চালাতে পারি। তাহলে আর প্রধান সড়কে আমাদের উঠতে হবে না।’

সরকার অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কি না, সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন গ্যারেজে ফের অটোরিকশা বানানোর ধুম লেগেছে। কয়েক দিন আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের আদেশের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থার খবরে মূলত ফের বাড়ছে সড়কে এই যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যার হিসাবে গত মাসে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ দুর্ঘটনা ব্যাটারিচালিত যানের জন্য ঘটেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরও বেশি। সড়ক নিরাপদ রাখতে হলে সরকারকে এ বিষয়গুলো মনিটরিং করতে হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রিকশা, ব্যাটারিরিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, ‘১২ বছর ধরে আমরা বলে আসছি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করেন। সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে বলেছি। এখন আমরা চাই খুব দ্রুত একটি নীতিমালা হোক। তাছাড়া এই নীতিমালা হলে কেউ ইচ্ছেমতো অটোরিকশা বানাতে পারবে না। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন যে অটোরিকশাগুলো চলছে সেগুলো সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একটি পায়েচালিত রিকশা যখন কনভার্ট (রূপান্তর) করে কোনোরকমে মোটর ও ব্যাটারি দিয়ে অটোরিকশা বানানো হয়, তখন সেগুলো চলাচলে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। কারণ যে অটোরিকশাগুলো দেখি সেগুলো মূলত পায়েচালিত রিকশার জন্য উপযোগী। সেগুলোর মানদণ্ড আর অটোর মানদণ্ড এক নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এই অটোরিকশা আরও ভালোভাবে মডিফাইড (সংশোধন) করে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের একটি মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে ব্রেকিং সিস্টেমও হাইড্রোলিক করতে হবে। একটি নীতিমালার আওতায় এনে শাখা সড়কগুলোতে এই রিকশা চলাচল করতে পারে। তবে শাখা সড়কগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে। তাই সেখানেও সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে, কোন রুটে কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার গুণগতমান আরও বাড়াতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে এসব রিকশার কাঠামো তৈরি করতে হবে। তাহলে এই যানগুলো যখন সড়কে চলবে, তখন আর আগের মতো ঝুঁকি থাকবে না সড়কে।’