ছোট দলের সভা-সমাবেশে বাধা

  • সমাবেশে বাধা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে হুমকি: আনু মুহাম্মদ
আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:৪০ পিএম

গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলকে। শক্তিপ্রয়োগসহ নানা কৌশলে পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে এসব দলের সমাবেশ। পাশাপাশি হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে হামলা ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের (চেতনা) পরিপন্থী। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার পতনের পর নতুন করে বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। সেখানে এ ধরনের হামলা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

আগামী ২৬ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীতে কৃষক মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা করেছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চিলমারীর আশপাশে প্রস্তুতিমূলক কৃষক সমাবেশ করছে দলটি। প্রচারের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রৌমারীতে কৃষক সমাবেশের আয়োজন করা হলে হামলা-ভাঙচুরের মুখে সমাবেশটি করা যায়নি।

এ ঘটনায় দলটির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মী আহত হন। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, রৌমারী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা হামলা চালিয়ে সমাবেশে পণ্ড করেছেন।

এ অভিযোগের বিষয়ে রৌমারী উপজেলা জামায়াতের আমির হায়দার আলী গণমাধ্যমকে বলেন, এ কৃষক সমাবেশে কোনো কৃষক ছিলেন না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাউকে ডাকা হয়নি। রাষ্ট্রের দায়িত্বে যারা আছেন তাদেরও ডাকা হয়নি। এ কারণে প্রশাসন তাদের মঞ্চ ভেঙে দেয়। তারপরও সমাবেশ করতে চাইলে সাধারণ জনতা হামলা চালায়। তাদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের দু-একজন থাকতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেন।

পাল্টা অভিযোগ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দোসর ইসকনের মতো লোক জড়ো করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা ছিল সমাবেশকারীদের।

এর আগে গত ২২ নভেম্বর (শুক্রবার) গাজীপুরে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সমাবেশ পণ্ড করে দেয় একদল যুবক। দলটির নেতারা জানান, বাসদের ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ছয় দফা দাবিতে গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে একদল যুবক হামলা চালিয়ে চেয়ার-টেবিল, মঞ্চ, সাউন্ড সিস্টেম ভাঙচুর করে সমাবেশ পণ্ড করে দেয়। সেখানে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয় দলটির পক্ষ থেকে। পরে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় উভয় দল।

এ ছাড়া গত ১৩ নভেম্বর (বুধবার) পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) পথসভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে ব্যানার-মাইক কেড়ে নেওয়া হয়। এ সময় সমাবেশস্থলের চেয়ার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলার সময় সিপিবির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বক্তব্য রাখছিলেন।

পথসভাটি ছিল জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে অনতিবিলম্বে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধসহ বেশ কিছু দাবিতে দলটির কেন্দ্র ঘোষিত ‘জাগরণ যাত্রা’ কর্মসূচির অংশ।

শরীয়তপুরে একই কর্মসূচি পালন করতে গেলে দলটির নেতাকর্মীর ওপর দ্বিতীয় হামলার ঘটনা ঘটে ১৬ নভেম্বর। সেখানে কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল সিপিবি ও অন্য কয়েকটি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের ব্যানারে। ফলে অন্য বাম দলের স্থানীয় নেতাকর্মীও সেদিন হামলার শিকার হন। বামজোটের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এ হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কী বলছে দলগুলো

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘বাংলাদেশে সংস্কারের যে আলাপ হচ্ছে সেখানে কৃষক ও কৃষি সংস্কারের বিষয়গুলো অনুপস্থিত। পরিবর্তনের এই আলাপের মধ্যে তাদের অন্তর্ভুক্তি নেই। সেই জায়গা থেকে কৃষি সংস্কারের জন্য আমরা সভা-সমাবেশ করছি। রৌমারীতে স্থানীয় জামায়াত নেতারা আমাদের ফ্যাসিবাদের দোসর বলে হামলা করেছে। এ ধরনের কাজগুলো আওয়ামী লীগও করত। এখন একই লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি বর্তমানে দাপটের সঙ্গে মাঠে থাকা দলগুলোর মধ্যে। অথচ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমি নিজে গুলিতে আহত হয়েছি। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা জেল খেটেছেন। অথচ এখন আমাদের বলা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জামায়াতের কাছে হামলার বিষয়টি স্পষ্ট করতে বলেছি। কিন্তু তারা সাড়া দেননি। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাকস্বাধীনতার জন্য, সভা-সমাবেশের জন্য আমরা লড়াই করলাম। জুলাইয়ে অভ্যুত্থান করলাম। স্বৈরাচার হাসিনা এসব করতে দিতেন না। এখন এই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সভা-সমাবেশে হামলা চলছে। পণ্ড করার চেষ্টা চলছে। আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু যারা এসব করছে তাদের মধ্যেও ফ্যাসিবাদের প্রবণতা রয়েছে। দেশের ঐক্য বিনষ্ট করতে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসব কাজ করছে।’

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলাম। এখন রাজনৈতিক ময়দানে যারা প্রভাবশালী হতে চাচ্ছে বা যারা তাদের শক্তি-সামর্থ্য দেখাতে চাচ্ছে, তাদের মধ্যেও সেই একই প্রবণতা দেখছি। বিভিন্ন এলাকায় তারা একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের জন্যই কমিউনিস্ট পার্টি বা অন্যদের ওপর হামলা করছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা যাতে সামনে না আসতে পারি। জনগণকে তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করতে না পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা এমন ঘৃণ্য কাজ করছেন তারা হলেন অগণতান্ত্রিক শক্তি। যদি এ ধরনের সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ না করা হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।’

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যাদের সভা-সমাবেশে হামলা করা হয়েছে তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পরীক্ষিত দল। বহু বছর ধরে তারা স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, লুটপাটের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে আসছে। তাদের ওপর যারা আক্রমণ করে, তাদেরই ফ্যাসিবাদের দোসর বলে মনে হয়। ফ্যাসিবাদ মানসিকতা না থাকলে তো সভা-সমাবেশে হামলা করার কথা নয়।’

তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের হামলা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বিপরীত যাত্রা। স্বৈরাচার পতনের মাধ্যমে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তার জন্য এটা বড় হুমকি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত