নতুন বাঁকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ

গণতন্ত্রের দাবিতে সিরিয়ায় ২০১১ সালে শুরু হয়েছিল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ। কিন্তু সরকারি বাহিনীর দমনপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে সহিংসতা দেখা দেয় সে আন্দোলনে। পরবর্তী সময়ে যা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আসাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। এরপর থেকে রক্তক্ষয়ী এ লড়াইয়ে ৫ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধ ২০২০ সাল থেকে স্তিমিত হয়েছিল অনেকাংশেই। আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধ শেষ না হলেও, গত চার বছর ধরে সংঘাতময় পরিস্থিতির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল। তবে ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় নতুন সংঘাতের দ্বারপ্রান্তেসিরিয়া। সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরটির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দক্ষিণের হামা শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস। এটিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর ২০১৬ সালে রুশ বিমান বাহিনীর সহায়তায় আলেপ্পোয় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে শহরটি পুনরুদ্ধার করেছিল প্রেসিডেন্ট আসাদের বাহিনী। এরপর থেকে গত নভেম্বর পর্যন্ত ইরান, রাশিয়া ও লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সমর্থন নিয়ে আলেপ্পো নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী আলেপ্পো থেকে অস্থায়ীভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এরই মধ্যে আলেপ্পো ও বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত ইদলিব প্রদেশে বিমান হামলা করেছে রাশিয়া ও সিরিয়া। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় এই হামলায় বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছে। সোমবার বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত সংস্থা হোয়াইট হেলমেটস একথা জানায়। তাদের দাবি, যৌথ এই বিমান হামলায় অন্তত দশজন শিশু নিহত হয়েছে। তবে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও মিত্র রাশিয়া বলছে, তারা শুধু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইদলিবে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ২০২০ সালে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর থেকে সেখানে যুদ্ধের মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছিল। এদিকে, আলেপ্পোতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রাসাদ দখল নিয়েছে বিদ্রোহীরা। পাশাপাশি আলেপ্পো মিলিটারি একাডেমির দখলও এখন বিদ্রোহীদের হাতে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বলেছে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর হামলার প্রতিশোধ নিতেই তারা সাম্প্রতিক আক্রমণ শুরু করেছে। তবে তারা হামার কেন্দ্রীয় শহরে পৌঁছেছেন কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে, বিদ্রোহীদের আলেপ্পো দখলের ঘটনায় দেশটিতে রুশ বাহিনীর দায়িত্বে থাকা জেনারেলকে বরখাস্ত করেছে মস্কো। অসমর্থিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া জেনারেলের নাম সের্গেই কিসেল। রুশ কর্নেল জেনারেল আলেকজান্ডার চাইকো তার স্থলাভিষিক্ত হবেন। সিরিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকা সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে রবিবার ফোনালাপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন এক যৌথ বিবৃতিতে সব পক্ষের প্রতি উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। সেই সঙ্গে অবকাঠামো ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতের কথা বলা হয় তাদের বিবৃতিতে।

দীর্ঘদিনের এই গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে চারটি পক্ষ। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত সরকারি বাহিনী ও আধা সামরিক গোষ্ঠী ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেস বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। আর সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস, এইচটিএস ও অন্যান্য সহযোগী বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং তুর্কি ও তুরস্ক-সমর্থিত সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী। সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কুর্দি অধ্যুষিত গোষ্ঠী। এটি পূর্ব সিরিয়ার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এইচটিএস হলো আল-নুসরা ফ্রন্টের নতুন সংস্করণ। অতীতে এটি আল কায়েদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকলেও, ২০১৬ সালে সে সম্পর্ক ছিন্ন করে এইচটিএস অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত হয়। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়া অন্য গোষ্ঠী তুরস্ক সমর্থিত বিদ্রোহী বাহিনী সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি