ত্রাণকর্মীদের জন্যও ভয়ংকর গাজা

প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায়। যুদ্ধের কারণে উপত্যকাটির প্রত্যেক বাসিন্দাই অন্তত একবার করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে অবহেলিত ছিটমহলটি। গাজার বেসামরিক নাগরিকদের পাশাপাশি তেল আবিবের নির্মমতা থেকে বাদ যায়নি অঞ্চলটিতে কাজ করা ত্রাণ ও মানবাধিকার কর্মীরাও। গত বছর অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত উপত্যকাটিতে অন্তত ৩৪১ জন মানবিক সহায়তা কর্মী নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এ তথ্য জানিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক সমন্বয় অফিসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ মন্তব্য করেন দুজারিক। এক সংবাদ সম্মেলনে দ্যুজারিক বলেন, সর্বশেষ ইসরায়েলি বিমান হামলায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের তিন কর্মী ও সেভ দ্য চিলড্রেনের একজন কর্মীসহ মোট চারজন মানবিক সহায়তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এর ফলে গত বছরের অক্টোবর থেকে নিহত মানবিক সহায়তা কর্মীর সংখ্যা বেড়ে ৩৪১ এ পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মানবিক সহায়তা সরবরাহকারী অংশীদাররা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান, বেসামরিক এলাকায় বোমা হামলা ও অবিস্ফোরিত বোমার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় খাদ্য ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫০ জনকে জিম্মি করে হামাস। এর প্রতিক্রিয়ায় গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গাজায় হামাসের হাতে জিম্মি ইসরায়েলিদের মধ্যে ৩৩ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে হামাস। ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর গত প্রায় ১৪ মাসে এসব জিম্মি নিহত হন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার এক ভিডিও বার্তায় হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়, নেতানিয়াহুর হঠকারিতা এবং তার চলমান আগ্রাসনের কারণে গাজায় এসব জিম্মি নিহত হয়েছেন। এদিকে, মাসের হাতে থাকা জিম্মিদের আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে মুক্তি না দেওয়া হলে চরম মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে দ্বায়িত্ব নেওয়ার আগে জিম্মিদের মুক্তি না দেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে চরম মূল্য দিতে হবে। যারা এই মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো সংঘটিত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পোস্টে তিনি কাদের উদ্দেশে এই মন্তব্য করেছেন সেটি পরিষ্কার করেননি। তার পোস্টে গাজার জিম্মিদের উল্লেখ করা হলেও, ইসরায়েলি অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শপথ গ্রহণের আগেই গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করার জন্য দুপক্ষকে চাপ দিতে পারেন ট্রাম্প। পোস্টে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার প্রশাসনকে কটাক্ষও করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গুলি বিনিময় করেছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। দক্ষিণ লেবাননের তালুসা ও হেরিস শহরে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়েছে। সোমবার ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানায়, তারা লেবাননের বিভিন্ন স্থানে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই দিন লেবাননের কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের অন্য অঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় আরও দুই জন নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার পরপরই হিজবুল্লাহ ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এই গোলাগুলির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় চলে গেছে। তবে এই অভিযোগের তদন্ত ও সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।