এক যুগ আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এক সাংবাদিককে হত্যাচেষ্টার অভিযোগের ঘটনায় তৎকালীন প্রক্টর ও দুই সহকারী প্রক্টরসহ নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ৯ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার হামলার শিকার সাংবাদিকের ছোট ভাই মো. রোকনুজ্জামান বাদী হয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী জজ কোর্টের আইনজীবী মো. জয়নাল আবেদীন।
ওই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম অডিটরিয়ামের সামনে এক সংবাদ সম্মেলন করেন বাদী মো. রোকনুজ্জামান। হামলার শিকার সাংবাদিকের নাম হাসান ইলিয়াছ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। হামলার সময় তিনি রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক লাল গোলাপ’র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ছিলেন।
অন্যদিকে মামলার আসামিরা হলেন- তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টর অধ্যাপক চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক তারেক নূর ও অধ্যাপক মুসতাক আহমেদ, নিষিদ্ধ সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী, শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হোসাইন বিপু, একই কমিটির সহ-সভাপতি ও বর্তমান গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আল আরাফাত রাব্বি, মাদার বখ্শ হল শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও বর্তমান তেজগাঁও শিল্প অঞ্চল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল আমিন বাবু। এ ছাড়াও ছাত্রলীগ কর্মী ও ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কামাল হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রোকনুজ্জামান বলেন, সাংবাদিক হাসান ইলিয়াছ ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলের স্টোর রুম থেকে ককটেল উদ্ধারের সংবাদ সংগ্রহ করতে যান। এ সময় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরিকল্পিত ভাবে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বর্বরোচিত আক্রমণ করে। ছাত্রলীগ ক্যাডার রুহুল আমিন বাবু হকিস্টিক দিয়ে তাকে পিটিয়ে জখম করে। এ ছাড়াও তাকে ইট দিয়ে মাথা ও মুখে আঘাত করে হলের সামনে থাকা পানির কুয়ার মধ্যে ফেলে চুবিয়ে ধরে রাখে।
আবার পানি থেকে উঠিয়ে আসামি আব্দুল আলীম, আল আরাফাত রাব্বি, আহম্মদ আলী মোল্লা এবং আবু হোসাইন বিপু রড ও জিআই পাইপ দিয়ে ভুক্তভোগীর পিঠে, কোমরে ও পায়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এমনকি আসামি কামাল হোসেন ও আহম্মদ আলী মোল্লা ভুক্তভোগীর পকেটে থাকা ফোন ও হাতে থাকা ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়।
তিনি আরও বলেন, হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টর ও দুজন সহকারী প্রক্টর। এ সময় ভুক্তভোগী নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে আকুতি মিনতি করেন। তবে তারা কোন প্রকার সাহায্য করার পরিবর্তে তার ওপর হামলার নির্দেশ দেয়। তাদের মৌন সম্মতি পেয়ে দ্বিতীয়বার রড ও হকিস্টিক দিয়ে সাংবাদিক হাসান ইলিয়াছকে সর্বশক্তি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে মৃত ভেবে আসামিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তার সহকর্মী সাংবাদিকরা তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
দীর্ঘদিন পর মামলা দায়ের করার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাদী মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘দীর্ঘদিন দেশে আইনের শাসন না থাকায় মামলা দায়ের করতে বিলম্ব হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিবারের পক্ষে মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই আপনাদের মাধ্যমে আমি আদালতের কাছে আমার ভাইকে হত্যাচেষ্টাকারী আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার আসামি ও তৎকালীন সহকারী প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক তারেক নূর বলেন, ‘আমার দায়িত্বপালনকালে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার মনে পড়ছে না। আমি আমার দায়িত্ব পালনে কোনো রাজনৈতিক দলকে এমন কোনো সম্মতি দেইনি।’