এক বিজয় করেছ আরেক বিজয় আসবে : প্রধান উপদেষ্টা

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান নিয়ে ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যার অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ মতবিনিময় সভা শুরু হয়।

গতকালের বৈঠকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘দেশের মানুষ ছাত্রদের ওপর ভরসা করে। এই বিশ্বাস ধরে রেখো। হাতছাড়া করো না। তোমরা কখনই আশাহত হবে না। তোমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছ। দেশ বদলিয়ে ফেলেছ। তোমরাই পারবে। মানুষের আশা তোমাদের পূরণ করতে হবে। অন্তত সে পথে তোমাদের অগ্রসর হতে হবে। এক বিজয় করেছ, আরেক বিজয় আসবে। তোমরা বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেবে যেন আমরাও সতর্ক হই, সজাগ হই।’

এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের রাষ্ট্রীয় খেতাব ও আহতদের সুচিকিৎসায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের জন্য জোর দিতে বলেন। এ ছাড়া গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।

প্রধান উপদেষ্টা শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আগে দেখা হয়েছে। আজকে অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। ভালো হলো। তোমাদের কথা শুনতেই মূলত আজকে বসা। তোমরা সরকারের কাছে কী চাচ্ছো, আশাগুলো কী, কোনো পরামর্শ আছে কি না, এটি জানতে চাওয়া।’

অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘তোমরা রাষ্ট্রের অভিভাবক, তোমাদের কারণেই রাষ্ট্র। এ ভূমিকা ভুলে যেও না। নিজেদের ভূমিকা ভুলে যেও না। অনেকে এখানে আছে, অনেকে নেই। যারা নেই, তারাও রাষ্ট্রের অভিভাবক। তোমাদের দায়িত্ব আছে রাষ্ট্র যেন ঠিক পথে চলে, যেন বিচ্যুত না হয়। এটুকু মনে রাখলে রাষ্ট্র ঠিক থাকবে। নিজের অভিভাবকত্ব ভুলে যেও না।’

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরামর্শকে স্বাগত জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য ঠিক থাকতে হবে। সিন্ডিকেট নাকি কী এ ধরনের ব্যাখ্যা আমরা চাই না। কতগুলো লোক বাজারমূল্য কবজা করে থাকবে, সেটা হতে পারে না। আমরা চেষ্টা করছি দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখার। আমরা দ্রব্যমূল্য স্টেবল (স্থিতিশীল) রাখতে চাই। রমজানেও দ্রব্যমূল্য স্টেবল রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিতে হবে। হঠাৎ করে যেন কোনো পরিস্থিতি না হয়।’

স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার পরামর্শে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার সংস্কারের জন্য কমিশন আছে। তারা পরামর্শ দেবে আমরা কাজ করব। আমরা চাই স্থানীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। খুব কম জিনিস উচ্চপর্যায়ে থাকবে। দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেম, একবার একটা ফান্ড বানিয়ে দিলে কারা যেন খেয়ে ফেলে। সেজন্য সুশৃঙ্খলভাবে সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন স্থায়ী হয়।’

জুলাইয়ে শহীদদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও খেতাবের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পরামর্শে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। জুলাইয়ে যারা শহীদ হয়েছে তাদের অবদান আমরা ভুলব না। তাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।’

শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের এমন পরামর্শের প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যেন বাংলাদেশে কেউ শিক্ষিত না হয়ে উঠতে পারে, দক্ষ হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য পরিকল্পিতভাবে এটা হয়েছে। বেকারত্ব তৈরি করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জন কিছু নেই। এটা আমাদের ঠিক করতে হবে। তরুণদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থার করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। প্রধান উপদেষ্টা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, আমাদের অর্থনীতি বিভাগে নারী শিক্ষার্থী ছিল মাত্র চারজন। তোমরা বলছ, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী প্রায় ৫২ শতাংশ। এটি অত্যন্ত আনন্দের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে আগে সিট বণ্টন হতো সেই দাসপ্রথা এখন ভেঙে গেছে। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।’

মতবিনিময়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও গণমাধ্যমে সরকারের কাজ সঠিকভাবে প্রচার না হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের এমন বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলে তারা সরকারের বিরুদ্ধে সরব এটা ঠিক। সরকারের নিজের কোনো পত্রিকা নেই। আছে শুধু প্রেস উইং। তারা পত্রিকায় প্রেস রিলিজ পাঠায়। কেউ ছাপে, কেউ ছাপে না কিংবা তাদের মনমতো শেষ পাতায় বা কোনায় ছোট করে দেয়। প্রেস উইং ওদের মতো করে চেষ্টা করছে, কাজ করছে। সরকার কোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করবে না। সংবাদপত্র স্বাধীনভাবে কাজ করবে এটাই আমাদের নীতি। আমরা এ নীতিতে থাকব। আমি বুঝতে পারছি তোমরা কিছুটা মনঃক্ষুন্ন। এটা আসলে কিছুটা মন খারাপ হওয়ার মতো যে, সরকারের কাজ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।’

শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে সংস্কারকাজে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তারা জানান, দেশের মানুষ সরকারের পাশে আছে। এটি গণমানুষের সরকার। জনগণ চায় অন্তর্বর্তী সরকার যেন প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজটি সম্পন্ন করে।

রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ, মুখপাত্র উমামা ফাতেমাসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন ও সদস্য সারজিস আলম। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও বৈঠকে ছিলেন।

বৈঠকের পর যমুনার ফটকে ছাত্রনেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষা খাত, নতুন সংস্কার প্রস্তাব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা মাঠের বর্তমান অবস্থা প্রধান উপদেষ্টাকে জানানোর চেষ্টা করেছেন।

এর আগে গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আজ বুধবার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ড. ইউনূস। বৃহস্পতিবার ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ঐক্য। ড. ইউনূস সবাইকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেবেন।

সাংবাদিকরা বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, ‘ইদানীং কিছু ঘটনা নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রয়াস আমরা দেখছি। অনেকাংশে দেখছি ভারতের গণমাধ্যম খুব আক্রমণাত্মকভাবে এ কাজগুলো করছে। এটার জন্য জাতীয়ভাবে ঐক্য তৈরি করে আমাদের বলতে হবে, তোমরা আসো, দেখো কী হচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় ঐক্যও ধরে রাখা, আমাদের জাতীয় ঐক্য এখানে খুব জরুরি।’ প্রেস সচিব বলেন, সবাই মিলে, ঐক্যবদ্ধভাবে এ অপতথ্যের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযানে নামতে হবে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ভারতে চলে যাওয়ার পর দেশের দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বেশ সরব ভূমিকায় রয়েছে ভারতের গণমাধ্যম; যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ এবং ‘সংঘবদ্ধ অপপ্রচার’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে বাংলাদেশ সরকার। সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে কয়েকবার বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও বেড়েছে। চিন্ময়ের জামিন নাকচের দিন তার সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে হত্যা করা হলে, সেই ঘটনার জন্য ইসকনকে দায়ী করে বক্তব্য দেয় বিভিন্ন দল, সেই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকেও দায়ী করা হয়। এর মধ্যে সোমবার আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ে হিন্দুত্ববাদী একটি সংগঠনের হামলা হয়, যাকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ হিসেবে বর্ণনা করে ‘ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া’ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে সংলাপে বসছেন প্রধান উপদেষ্টা। এর আগে গত ২৭ নভেম্বর বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন। সেদিন বৈঠকের পর প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছাত্র-জনতা, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সবার প্রতি’ জাতীয় ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।