রক্ষণের খোলস ছেড়ে বের হতে গিয়েই যেন খেই হারিয়ে ফেললেন আলবিসেলেস্তেরা। শেষ ৩২-এর ম্যাচে আফ্রিকার পুঁচকে দেশ কেপ ভার্দে যেভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তা এখনো সমর্থকদের মনে টাটকা। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় ৩-২ গোলে কোনোমতে জিতে শেষ ১৬ নিশ্চিত করলেও লিওনেল স্কালোনির দলের সেই চেনা ধার উধাও ছিল। বিশেষ করে দলের মূল চালিকাশক্তি, অর্থাৎ মধ্যমাঠ পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছিল সেই ম্যাচে। আজ মঙ্গলবার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মহাগুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে আরেক আফ্রিকান পরাশক্তি মিসরের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। আর কেপ ভার্দে ম্যাচের সেই ‘মধ্যমাঠের ক্ষত’ই এখন মিসরকে নিয়ে নতুন শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের শিবিরে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের ট্রানজিশন বা বলের জোগান দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল ধীরগতির এবং ছন্নছাড়া। এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টাররা বলের নিয়ন্ত্রণ রাখলেও ফাইনাল থার্ডে গিয়ে সেই চেনা সৃজনশীলতা দেখাতে পারেননি। মধ্যমাঠ থমকে যাওয়ায় বারবার নিচে নেমে আসতে হয়েছে ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে, যা তাঁর শক্তির অপচয় ঘটিয়েছে।
মিসর ম্যাচের আগে এই দুর্বলতা ঢাকতে মাঝমাঠে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন কোচ স্কালোনি। রবিবারের অনুশীলনে তিনি পরীক্ষার ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন। রক্ষণাত্মক জমাটবদ্ধতা ফেরাতে এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে অ্যালেক্সিসের জায়গায় লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে শুরু থেকেই খেলানোর জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পারেদেস এলে মাঝমাঠ কিছুটা শান্ত ও গোছানো হবে। তবে আক্রমণভাগের ধার বাড়াতে স্কালোনির ট্রাম্পকার্ড হতে পারেন থিয়াগো আলমাদা বা নিকোলাস গঞ্জালেস। এ ছাড়া স্ট্রাইকার পজিশনে লাউতারো মার্টিনেজ নাকি হুলিয়ান আলভারেজকে মেসির সঙ্গী হবেন, তা নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। প্রতিটি লাইনেই অন্তত একটি করে পরিবর্তন আসার আভাস মিলছে আলবিসেলেস্তেশিবিরে।
আর্জেন্টিনা যখন নিজেদের হারিয়ে খোঁজা মধ্যমাঠ জোড়াতালি দিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ইতিহাস গড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চোখ রাখছে ‘ফারাও’রা। শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম নকআউট জয় তুলে নিয়েছে মিসর। দলটির সহকারী কোচ ইব্রাহিম হাসান তো সরাসরি আর্জেন্টিনাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন। তার মতে, ‘আর্জেন্টিনার মেসি থাকলে আমাদের মোহামেদ সালাহ আছে। অইর সালাহর পাশে লড়ার জন্য আমাদের আরও ২৬ জন ‘মেসি’ (লড়াকু খেলোয়াড়) আছে।’
মিসরের অন্যতম বড় শক্তি তাদের মানসিকতা বা স্থানীয় ভাষায় ‘গ্রিন্তা’ (জিদ ও লড়াইয়ের মানসিকতা) । গোলরক্ষক মোস্তফা শুবায়ের স্পষ্ট জানিয়েছেন চোটের কারণে স্কোয়াডে ঘাটতি থাকলেও দেশের মানুষের জন্য তারা শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত জানপ্রাণ দিয়ে লড়বেন।
মিসরের সাবেক সহকারী কোচ টিটো গার্সিয়া সানজুয়ান ফিফাকে জানিয়েছেন, এই মিসর দলটির ভিত্তি কেবল সালাহ নন, বরং তাদের দলগত সংহতি। মিসরের ফুটবলাররা রাস্তাঘাটে খেলে বড় হয়, তাই প্রতিটা বলের জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই করার এক সহজাত তাগিদ তাদের রক্তে রয়েছে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে মিসর ৪ বা ৫ জন ডিফেন্ডার নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে নিজেদের রক্ষণকে দেওয়াল বানিয়ে ফেলতে পারে। কেপ ভার্দের চেয়ে তাদের ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন অনেক বেশি পরিপক্ব। মিসরের ২৬ সদস্যের দলের ১৭ জনই খেলেন মিসরের ঘরোয়া লিগে, যার মধ্যে আটজনই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আল আহলির। ফলে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক বোঝাপড়া বিশ্বমানের, যা আর্জেন্টিনার তারকাখচিত কিন্তু ছন্নছাড়া মধ্যমাঠের জন্য বড় ফাঁদ হতে পারে।
বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর বিপক্ষে টানা ৮ ম্যাচ জেতার রেকর্ড রয়েছে আর্জেন্টিনার। অন্যদিকে মিসরের শেষ ৬ বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রতিটিতেই উভয় দল গোল করেছে। আর্জেন্টিনা টানা ২৪ ম্যাচে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামলেও, মধ্যমাঠ যদি কেপ ভার্দে ম্যাচের মতো আবারও নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে সালাহ ও মিসরের ‘স্ট্রিট ফাইটাররা’ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শিরোপা ধরে রাখার মিশন শেষ ১৬-তেই থামিয়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।