সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে হয়ে ওঠে পারকি সৈকত

একটু পানি থাকলেই ‘সৈকত’ আর একটু গাছপালা থাকলেই যেন ‘বনাঞ্চল’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এমন চিত্র। এটুকু সুযোগ কাজে লাগিয়েই তারা পর্যটক আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। অথচ ঝাউবনশোভিত চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকতের মতো স্থান থাকার পরও তা অবহেলায় পড়ে আছে। পর্যটনসমৃদ্ধ এই সৈকত পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা তো দূরের কথা, এখনো নিরাপদই হয়ে উঠতে পারেনি। সন্ধ্যা নামতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে সৈকত এলাকা, তৈরি হয় ভুতুড়ে পরিবেশ। ফলে দিন দিন পর্যটকবিমুখ হয়ে পড়ছে পারকি সৈকত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতে যাওয়ার সড়কগুলো সংস্কারের অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে। পর্যটক বাড়লেই সংকীর্ণ সড়কগুলোয় দেখা দেয় যানজট। নেই পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। সড়কের দুর্ভোগ পেরিয়ে সৈকতে এলে ময়লা-আবর্জনার মুখোমুখি হতে হয়। আছে বখাটেদের উৎপাত, মাদকের ছড়াছড়ি। নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি রাতযাপনে নেই আবাসিক সুবিধা। তেমনি আছে আলোর স্বল্পতা। এ ছাড়া সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা জলাধারগুলোর পানি নেমে ভাঙছে ঝাউবন ও বিস্তীর্ণ সৈকত। এ যেন অভিভাবকহীন এক পর্যটনকেন্দ্র। সম্ভাবনা বিকাশে নেই পরিকল্পিত কোনো ধরনের পদক্ষেপ। জটিলতার অবসান হয় না কিছুতেই। সংকটের ভেতর দিয়েই ডানা মেলছে পারকি সৈকত।

সৈকতে যাওয়ার চারটি উপসড়কের একটিও চলাচলের উপযোগী নয়। এই চারটি সড়কে বিপজ্জনকভাবে উঠে আছে ইটের ভাঙা অংশ। এবড়োখেবড়ো সড়কগুলো দিয়েই প্রতিদিন কষ্ট সয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পর্যটকদের। তবে ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে আখতারুজ্জামান সড়কের আরসিসির কাজ করা হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী তসলিমা জাহান।

এদিকে সৈকত জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা এখানকার সৌন্দর্যকে মøান করে দিয়েছে। শিরিন আক্তার নামে এক পর্যটক বলেন, ‘আমরা এ সৈকতে সুন্দর পরিবেশে দিন কাটাতে এসেছি। কিন্তু সৈকতের নোংরা পরিবেশ এবং অব্যবস্থাপনা দেখে খুবই খারাপ লেগেছে। তা ছাড়া সৈকতে বখাটেদের উৎপাত বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এ কারণে পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন না। পর্যটকদের উত্ত্যক্তসহ ছিনতাই, রাহাজানির মতো ঘটনাও ঘটছে।’

তিনি আরও জানান, সৈকতে নেই কোনো উদ্ধারকর্মী, নেই টহলের ব্যবস্থা। বিশেষ দিনে পুলিশি টহলের ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সৈকতের কোথাও কোনো সতর্ক নির্দেশনা-সংবলিত সাইনবোর্ড নেই। নেই উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় নেই ট্যুরিস্ট পুলিশও। সৈকতে স্বাস্থ্যসম্মত রেস্তোরাঁর অভাবের পাশাপাশি নেই মানসম্মত আবাসিক সুবিধা। এ কারণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই ফিরে যান পর্যটকরা।

স্থানীয়রা জানান, সৈকতে হাত বাড়ালে খুব সহজেই মাদকদ্রব্য মিলছে। ইয়াবা, বিদেশি মদ, চোলাই মদ প্রভৃতি রকমারি মাদকে ছেয়ে গেছে এই সৈকত। মাদকের এত ছড়াছড়ি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৈকতের একজন দোকানদার জানান, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তারা মদের বোতল বা ইয়াবা বালুর ভেতরে পুঁতে রাখেন। কাস্টমার চাইলে সেখান থেকে তুলে এনে তাদের কাছে বিক্রি করা হয়।

সৈকতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে পারকি সৈকতকে পর্যটন এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। স্বীকৃতির এক যুগ পার হলেও এখানে সেই অর্থে কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে শঙ্খ নদের মোহনা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সৈকত। সেখানে পারকি এলাকার দুই কিলোমিটারে পর্যটকরা যান। এখানকার একটি অংশে সৃজন করা ঝাউগাছ আছে। সৈকতের প্রস্থ কোনো কোনো অংশে এক কিলোমিটারের কম বা বেশি। পারকি সৈকত এলাকার বিভিন্ন মৌজা থেকে সরকার ৬৭৫ একর জায়গা পর্যটনের গেজেটভুক্ত করে। সেখান থেকে ১৩ দশমিক ৩৩ একর জায়গায় আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স করা হচ্ছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শুরু করে পর্যটন করপোরেশন। তবে এখনো প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ বাকি।

বারশত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ কাইয়ুম শাহ জানান, স্থায়ী আলোকায়নের ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পরই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে পারকি সৈকত। আলোর স্বল্পতার কারণে রাতে সৈকতে আসা দর্শনার্থীরা নানা সমস্যায় পড়ছেন। সমুদ্রসৈকতের সন্ধ্যা আলো-আঁধারিতে কাটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, ‘সৈকতে মোটরসাইকেলসহ গাড়ি চলাচল বন্ধে অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছি। অনেক ছিনতাইকারীকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু তা দমানো যাচ্ছে না।’

কর্ণফুলী থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, পারকি সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশের একটি টিম নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে।

আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলী অসীম শীল জানান, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শাহীদ বলেন, পারকি সৈকত এলাকায় পাউবোর জায়গাগুলো উদ্ধারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম বলেন, ‘পারকি সৈকতকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কিটকট স্থাপন, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, অস্থায়ী বিচ-মার্কেট, ফুড কোর্ট, কফি জোন, কিডস জোন, বাইক জোন, গণশৌচাগার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, পারকি থেকে পতেঙ্গা সৈকতে যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতে জেটি নির্মাণ ও সৌরবাতির ব্যবস্থা করা। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’