রোমান সানার পড়তি ফর্মে খুব বেশি উচ্চারিত হয়েছিল হাকিম আহমেদ রুবেল নাম। ছিলেন জাতীয় আরচারি দলের সদস্য। খেলা ছেড়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় পাড়ি জমিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। গোপনে দেশত্যাগ নিয়ে এতদিন নিশ্চুপ ছিলেন রুবেল। তবে দুমাস প্রবাস জীবন পার করে মনের কথা খুলে বলেছেন দেশ রূপান্তর-এর সুদীপ্ত আনন্দর কাছে-
দুমাস হয়ে গেল দেশ ছেড়ে গেছেন। নিউ ইয়র্কে কেমন কাটছে সময়?
হাকিম আহমদে রুবেল : আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি ভাই। আসার পর মনে হতো খেলা ছেড়ে এখানে এসে কীভাবে থাকব। তবে যখন আসার আসল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে পূরণ হতে দেখছি, তখন সব খারাপ লাগা দূর হয়ে গেছে। দেশ ছাড়ার কোনো অনুশোচনা নেই আমার মধ্যে। শুধু একটু খারাপ লাগে যে প্রিয় খেলাটা এখন আর খেলতে পারছি না। ওইটুকুই। এর বাইরে কোনো খারাপ লাগা নেই। এতদিন জাতীয় দলে টানা খেলার পরও যখন দেখি আমার আর্থসামাজিক কোনো উন্নতি হয় না, তখন খেলতে না পারার কষ্টটা দূর হয়ে যায়।
তারপরও জাতীয় দলে খেলেছেন বলেই তো এত পরিচিতি পেয়েছেন। এত এত জায়গায় যেতে পেরেছেন? কখনো কি মনে হয় না দেশকে আপনি ঠকিয়েছেন?
রুবেল : সত্যি বললে এ রকমটা আমার কখনই মনে হয়নি। এটা ঠিক আরচারি খেলেছি বলেই আমি এখানে আসতে পেরেছি। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে। সে সময় পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা পেয়েছিলাম। সেটা ব্যবহার করে গত অক্টোবরে এখানে আসি। আরচারি না খেললে নিশ্চয় এই সুযোগটা পেতাম না। তবে দেশকে ঠকিয়েছি, সেটা মানতে রাজি নই। বরং বলতে পারেন দেশকে দিতে গিয়ে অনেক কিছুই ছাড়তে হয়েছে। আরচারি খেলতে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। আর্থিক কোনো সচ্ছলতা ছিল না। আমি আমার পরিবারের একমাত্র ছেলে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন, এখন অবসরে। আমার বয়স এখন ২৫-এর কাছাকাছি। আরও আগে থেকেই পরিবারের হাল ধরা উচিত ছিল আমার। তবে খেলেছি বলে সেটা পারিনি। আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক জিতেছিলাম বলেই তো আরচারি নিয়ে দেশে এত শোরগোল। সবাই আমরা এই খেলার সম্ভাবনার কথা বলি। অথচ আমরা যারা কঠোর পরিশ্রম করে দেশের জন্য কিছু বয়ে আনি, তখন আমাদের ভাগ্যে কিছু জোটে না। দেশে ফেরার পর ফেডারেশনের কর্তারা এসে ভালো ভালো কথা বলেন, বাহবা দেন, মিষ্টিমুখ করান। একটু ভালোমন্দ খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমরা কিছুই পাই না।
বুঝতে পারছি ভীষণ হতাশা থেকেই খেলা ও দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত?
রুবেল : ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলার হলে হয়তো এই হতাশাটা থাকত না। ওরা কিন্তু খেয়েপরে দেশে ভালোই আছেন। আমি এখানে আছি দুই মাস। এখানে এসে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যারা এক সময় ফুটবল-ক্রিকেটের বাইরের বিভিন্ন খেলায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তারা দেশে ভালো থাকতে না পেরেই প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন। এবং আমি তো বলব, তারা ঠিকই করেছেন। আমার নিজের কথাই বলি। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকলে মাসিক ৩ হাজার করে টাকা পেতাম। আর এখন মাসে পাই ৩ হাজার ডলার। এই টাকার থেকে কিছুটা নিজের থাকা-খাওয়ায় খরচা হয়। বাকি বড় একটা অংশ আমি আমাদের পরিবারের কাছে পাঠাতে পারছি। আর্থিক নিরাপত্তা আছে বলেই, খেলা ছাড়ার দুঃখ ভুলতে পেরেছি।
ফেডারেশন যে আপনাদের মূল্যায়ন করেনি এ নিয়ে তো অনেক কথাই হয়েছে। অনেকেই স্বেচ্ছায় খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। তারপরও কেন তাদের বোধোদয় হয় না?
রুবেল : এসব বিষয় নিয়ে দেশে আমরা অনেকবার ফেডারেশন কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বলেছি ক্যাটাগরি করে আমাদের এমন কিছু দেওয়া হোক, যেটা দিয়ে নিজের হাতখরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও কিছু দিতে পারি। আজ যদি দেশে আর্থিক নিরাপত্তা থাকত, তাহলে তো জাতীয় দল ছেড়ে বিদেশে আসার প্রশ্নই থাকত না।
আপনি তো চার বছর পুলিশ আরচারি দলের হয়ে খেলেছেন। সেখান থেকে তো কিছু পেতেন?
রুবেল : খেলোয়াড় হিসেবে মাসিক একটা বেতন নিয়মিতই পুলিশের কাছ থেকে পেয়েছি। তবে সেটা ছিল চাহিদার তুলনায় কম। পুলিশ বিভাগের কাছে আমাদের দাবি ছিল যাতে, চাকরি দিয়ে আমাদের নেওয়া হয়। একটা প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের ঘটনার পর সব ভেস্তে যায়। অনেক স্যারই চাকরিচ্যুত হন। এসব দেখে খুব হতাশায় ভুগতে থাকি। সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আসার সিদ্ধান্ত। একটা কথা বলে রাখি, এখানে যদি সম্ভব হয় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।
তার মানে কি আরচার হওয়াটাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
রুবেল : একভাবে ভাবলে তাই। আরচারি আমাদের কিছুই দিতে পারেনি। এমনকি অলিম্পিকের স্কলারশিপের পুরো টাকাটা এখনো পাইনি। আট মাসের বকেয়া টাকা আমি, আব্দুর রহমান আলিফ ও দিয়া সিদ্দিকী পাব কি না সেটা সময়ই বলে দেবে। তাই বলতে পারেন, আরচার হওয়াটা আমার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং ক্রিকেট-ফুটবল খেললে অন্তত কিছু করে খেতে পারতাম। আমার পরিবারটাও বেঁচে যেত। এখন তাই খেলা নিয়ে আমার কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। এখন লক্ষ্য একটাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমার পরিবারকে একটু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া।
রুবেলকে তাহলে আর আরচারি অঙ্গনে দেখা যাবে না?
রুবেল : আমার ভিসার ধরন অনুযায়ী আমাকে প্রতি ছয় মাস পরপর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথা। এখানে এসে আমি এর মধ্যেই ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার জন্য আবেদন করেছি। আশা করছি এক সপ্তাহের মধ্যে একটা সুসংবাদ পাব। সেটা পেয়ে গেলেই গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করব। সব কিছু ঠিক থাকলে এক বছরের মধ্যে গ্রিনকার্ড পেয়ে গেলেই নিশ্চিন্ত হব। যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তবে আর খেলাধুলা নিয়ে চিন্তা করব না।
সত্যি বলছেন তাতে খারাপ লাগবে না?
রুবেল : সত্যি বলছি, আমার খারাপ লাগে না যখন ভাবি আমার কারণে আমার পরিবার কিছুটা হলেও সুখী হতে পেরেছে। এখন এখানে খানিকটা লুকিয়ে কাজ করতে হয়। তাই বেশিরভাগ সময় রাতে কাজ করি। ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে গেলে তো দিনেও কাজ করতে পারব। তখন আরও বেশি উপার্জন করতে পারব।