সংকুচিত হচ্ছে ঢাবিতে সাংস্কৃতিক পরিসর!

সাংস্কৃতিক চর্চার পীঠস্থান বলা হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। নির্দিষ্ট করে বললে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এর জন্য সুপরিচিত। এখানে বসে নানান গান, আড্ডা, কবিতার আসর৷ তবে সাংস্কৃতিক চর্চার এই পরিবেশ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার পাশাপাশি স¤প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি আবারো সামনে আসে।

গত শনিবার শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  ক্যাম্পাসে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে মাইক বাজিয়ে যে কোনো অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তার আগে ওইদিন রাতে টিএসসিতে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গান বাজিয়ে প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উচ্চস্বরে স্পীকার/মাইক/গাড়ির হর্ণ বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৬টার পর টিএসসি, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, হল ও আবাসিক এলাকায় স্পীকার/মাইক ব্যবহার করে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না।

তবে এরপর থেকে বিভিন্ন মহল থেকে এর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। কেউ কেউ বলছেন এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসরকে সংকুচিত করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ঢালাওভাবে বন্ধ না করে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা আমলে নিয়ে টিএসসি ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানে আসা প্রয়োজন ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইনডোরে এসব অনুষ্ঠান করা যাবে।

ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা ৬ টার পরে টিএসসি সংলগ্ন এলাকায় মাইক ব্যবহার না যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত টিএসসি কেন্দ্রীক সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করবে। টিএসসি, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্ত¡র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এছাড়াও বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি রাজু ভাস্কর্য দাবি-দাওয়া ও আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রোকেয়া হল এবং শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থীদের শব্দদূষণের কবলে পরতে হয় এটি যেমন সত্য, তেমনি টিএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র এটিও আমাদের মেনে নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অসুবিধা আমলে নিয়ে টিএসসি ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানে আসা প্রয়োজন। ঢালাওভাবে সন্ধ্যা ৬ টার পর মাইক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা অগণতান্ত্রিক এবং সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করবে বলে আমরা মনে করি। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।

নোটিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের নোটিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরাচারী  মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ সংকুচিত হবে।অবিলম্বে এ ধরণের অগণতান্ত্রিক নোটিশ প্রত্যাহার করতে হবে। 

গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে বিগত সময়ে প্রশাসন এরকম বহু অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে অগণতান্ত্রিক এবং ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আপাত দৃষ্টিতে এটি শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার কথা বলে করা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথকে বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করা।

দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীরা শব্দ দূষণের ভুক্তভোগী উল্লেখ করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুননাহার হলের শিক্ষার্থী আশরেফা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিএসসি এরিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের দুটি আবাসিক হল। এখানে শুধু সাংস্কৃতিক না সব ধরনের প্রোগ্রাম হচ্ছে। সেখানে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো হয়। যেহেতু এটা আবাসিক হল, আবাসিক হলের পরিবেশ পাওয়াও আমার অধিকার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শব্দ দূষণের ভুক্তভোগী। যারা এই হলগুলোতে থাকে না তারা বাইরে থেকে বুঝবে না এটা ছাত্রীদের জন্য কতটা অস্বস্তির কারণ। তাদের পড়াশোনার কোনো পরিবেশ থাকে না।

তিনি বলেন, যদি টিএসসির উদ্দ্যশ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা, তাহলে আমি এখানে দ্বিমত পোষণ করছি না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেই পারে। যদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার একমাত্র উদ্দ্যশ্যে শব্দ দূষণ হয়, উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে সংস্কৃতিকে পুনর্জাগরণ করতে হয় তাহলে সেখানে বলার কিছু নেই। কেউ যদি বলে আমরা সংস্কৃতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি, তাদের বলে দিতে চায় এখানে যে হলগুলো আছে এই হলগুলোতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীরাও থাকেন। তারা নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। যে সংস্কৃতি এ ধরনের শব্দ দূষণকে সমর্থন করে, সে ধরনের সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন থাকে। আমি বলতে চাই সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে উচ্চ শব্দের কোনো সম্পর্ক নেই। সাংস্কৃতিক চর্চা শব্দ দূষণ করা ছাড়াও করা যায়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা টিএসসি এবং আবাসিক হলের খোলা জায়গায় সন্ধ্যা ৬টার পর উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে অনুষ্ঠান না করতে নিরুৎসাহিত করেছি। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ক্ষতির কারণ হয়। এই অনুষ্ঠানগুলো ইমডোরে করলে কোনো সমস্যা নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি বলেন, কেউ যদি এ বিষয়ে আপত্তি জানায়, সিচুয়েশন আসলে আবার বসে কথা বলা যাবে। এটি আলোচনা যোগ্য বিষয়। যেকেউ কথা বলতেই পারে, দাবি জানাতে পারে। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছি।