প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থার ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। মিয়ানমারে গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোয় আশ্রয় নিয়েছে। চলতি শতাব্দীর অন্যতম মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করলেও বিশ^মানবতা রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি। তদুপরি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাড়ছেই। বিদ্রোহী শক্তিগুলো ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং সীমান্ত এলাকাগুলো দখলে নিচ্ছে।
এমতাবস্থায়, ফের রোহিঙ্গাসহ দলে দলে মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মিয়ানমারের নৌ-সীমানা বাংলাদেশের নৌযানগুলোর জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। গত রবিবার বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরও শতভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এরপর নাফ নদের মিয়ানমারের অংশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌচলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তারা। ফলে, গত বুধবার কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছিল উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে নাফ নদের বাংলাদেশের জলসীমায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে, দুদিন পরেই কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদে নৌযান চলাচলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অবশ্য টেকনাফের কোনো নৌযান যেন বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম করে মিয়ানমারের জলসীমায় না যায়, তার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ সতর্কতা। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে যাত্রীবাহী নৌযান কোস্ট গার্ডের নিরাপত্তায় চলাচল করবে।
গত শুক্রবার বিকেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহেসান উদ্দিন। তিনি জানিয়েছেন, নাফ নদে দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। তা গত সরকারের আমল থেকে কার্যকর। এখনো নাফ নদে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তবে নাফ নদ দিয়ে সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলার যাতায়াত করতে পারবে। বিষয়টি নিয়ে ট্রলার মালিক, জেলেদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে যাত্রীবাহী নৌযান চলবে কোস্ট গার্ডের নিরাপত্তায়। এর জন্য সব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা বাংলাদেশের মূলনীতি। মিয়ানমারে দীর্ঘ সামরিক শাসন, সংঘাত ও জাতিগত বৈরিতায় সব সময় তা মান্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ অবশ্য সব সময়ই সংহত থেকেছে এবং বিপুল পরিমাণ মানুষকে আশ্রয় দিয়ে নিজের আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ বৃদ্ধি করে হলেও শান্তি বজায় রেখেছে। তবু নিজের দেশের মানুষ ও জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের উত্তেজনার প্রভাব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের ওপর যাতে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যায়, সে ব্যাপারে কূটনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। একসময় এ দুই অঞ্চলের মধ্যে বিপুল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। দুদেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কও বেশ শক্ত। ভাষা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস মিলিয়ে দেখলে নাফ নদের দুপাড়ের মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি খুবই সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে, বাংলাদেশের তরফ থেকে এর রাজনৈতিক সমাধান জরুরি। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ সমস্যার আশু সমাধান মুশকিল বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে জলসীমানা ছাড়া পুরো সীমান্ত এলাকা ও এর আশপাশের মানুষের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়াটাই এখন মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা উচিত। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে আছেন। এর উপশম করা দরকার। আবার, আর্থিক ও বাণিজ্যিক কারণেও জলসীমা এবং সমুদ্রবাণিজ্য যাতে ব্যাহত না হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে।