কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম রসুল। তিনি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। সম্প্রতি বাজার ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা চলমান রয়েছে। এসব নিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সহ-সম্পাদক সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : এবার বৈশ্বিক ক্ষুধাসূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু এখনো মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা আছে। এখানে অগ্রগতি হওয়াটা কী রকম এবং মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা বলতে আমরা কী বুঝব?
গোলাম রসুল : গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২৪-এ ১৮৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের র্যাংক ৮৪ হয়েছে এবং মডারেট লেভেলের হাঙ্গারে স্কোর হচ্ছে ১৯.৪। এখন এই মডারেট বলতে কী বুঝি বা এটা কী? আসলে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ৫ স্কেলে হয়। স্কেল হচ্ছে ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত। লো হাঙ্গার, মডারেট হাঙ্গার, সিরিয়াস হাঙ্গার, অ্যালার্মিং হাঙ্গার, এক্সট্রিমলি অ্যালার্মিং হাঙ্গার। যারা ০ তারা লো হাঙ্গার। ০ থেকে ৯.৯ এর নিচে লো হাঙ্গার। লো হাঙ্গার মিনস তারা সবচেয়ে ভালো। যারা ১০ থেকে ১৯.৯ এর মধ্যে তারা হচ্ছে মডারেট হাঙ্গার। আর যারা ২০ থেকে ৩৪.৯ তারা সিরিয়াস হাঙ্গারে আছে। আমরা গত বছর সিরিয়াস হাঙ্গারের গ্রুপে ছিলাম, এবার সিরিয়াস হাঙ্গার থেকে মডারেট হাঙ্গারে গেলাম। এরপর ৩৫ থেকে ৪৯.৯ হলো অ্যালার্মিং হাঙ্গার আর ৫০-এর ওপর হলে সেটা এক্সট্রিমলি অ্যালার্মিং হাঙ্গার যেটা আফ্রিকার কিছু দেশে আছে। গত বছর আমরা ছিলাম ২০ দশমিক সামথিং। এবার আমরা ২০ থেকে নেমে ১৯.৯ গ্রুপে চলে এসেছি। যেহেতু আমরা মডারেট গ্রুপ এ জন্য বলা হচ্ছে আমাদের কিছু উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উন্নতিটা খুব বড় না। কারণ, আমাদের দেশে এখনো কিন্তু অপুষ্টি সমস্যা আছে। এই ইনডেক্স করা হয় ৪টা ইন্ডিকেটর দিয়ে অপুষ্টির মাত্রা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চতা অনুযায়ী কম ওজন, বয়স অনুযায়ী কম উচ্চতা এবং শিশুমৃত্যুর হার। আমাদের প্রায় ১২ শতাংশ লোক অপুষ্টিতে ভুগছে। এই নাম্বারটা অনেক বড়, তারপর আমাদের বাচ্চাদের ওজন কম। আমাদের প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজন বাচ্চা ক্ষুধাজনিত কারণে খাটো। আমাদের এখনো ২.৯শতাংশ শিশু ৫ বছরের আগে মারা যাচ্ছে। তো এই ইন্ডিকেশনগুলো এখনো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০৩০ সালের মধ্যে যে আমাদের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল, সেখানে আমাদের জিরো হাঙ্গার হতে হবে। জিরো হাঙ্গারে যেতে আমাদের সরকারি এবং বেসরকারি সবাই মিলে অনেক সিরিয়াসলি কাজ করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বেশ কিছুদিন ধরে সারা বিশ্বেই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা আলোচনায় ছিল বা এখনো আছে। বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার নিরিখে বাংলাদেশের বাস্তবতাটা কেমন?
গোলাম রসুল : বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টা কিন্তু আমাদের জন্য এখনো একটা চ্যালেঞ্জিং হিসেবে রয়ে গেছে। গত প্রায় ২ বছর থেকে জনগণ কিন্তু উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। আপনি জানেন, ডিসেম্বরের ৫ তারিখে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস নভেম্বর মাসের যে মূল্যস্ফীতি দিয়েছে সেখানে দেখা গেছে আমাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩.৮০। গত কয়েক বছর থেকে আমাদের এই খাদ্য মূল্যস্ফীতিটা কিন্তু ৯ শতাংশ বা ১০ শতাংশের ওপরে যাচ্ছে। ফলে দেশের যে দরিদ্র জনগণ বা স্বল্প আয়ের লোকজন, তাদের জন্য এই উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতিটা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশ রূপান্তর : বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধের বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও দেখা গেছে মূল্যস্ফীতি কমেছে কিন্তু আমাদের এখানে তো কমেনি।
গোলাম রসুল : হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছেন। কারণ আমাদের দেশে কিন্তু কভিডের পর থেকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিটা খুব হাই হয়ে যায় ২০২২ সালে যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। ঐটার দারুণ একটা প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওভারঅল মূল্যস্ফীতিতে এবং ম্যাক্রো ইকোনমি স্টাবিলিটিতে। যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্বেই ফুডের প্রাইস বেড়ে গেল। ফুড সাপ্লাই চেইনটা ভেঙে পড়ছিল। পরে ফার্টিলাইজারের দাম বেড়ে গিয়েছিল এবং এনার্জির প্রাইস বেড়ে গেছে। এনার্জির প্রাইস বেড়ে গেলে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচটা বেড়ে গেছে। কারণ এনার্জির সঙ্গে সবকিছুর দাম বাড়ে। পরে গ্লোবাল ক্রাইসিসটা মোটামুটি কমলে গ্লোবাল মার্কেটেও স্ট্যাবিলিটি আসে কিছুটা। কিন্তু বাংলাদেশে দাম কমেনি। এটার কারণ হচ্ছে, আমাদের বেসিক ফান্ডামেন্টাল চেঞ্জ হয়ে গেছে। মানে উৎপাদন খরচটা বেড়ে গেছে, ট্রান্সপোর্ট খরচ বেড়ে গেছে। এছাড়াও গভর্নমেন্টের যে ম্যানেজমেন্ট, ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট পলিসি যেভাবে নেওয়া উচিত ছিল, বিশেষ করে এক্সচেঞ্জ রেট, ম্যানেজমেন্ট, ইন্টারেস্টেড, আমাদের মনিটরিং পলিসি যেগুলো ছিল সেগুলোও আমরা বোধহয় প্রপারলি হ্যান্ডেল করতে পারিনি।
দেশ রূপান্তর : রেজিম চেঞ্জের ফলে ফান্ডামেন্টাল জায়গা এবং এই বাজার ব্যবস্থাপনায় কি কোনো পরিবর্তন দেখতে পারছেন আপনি?
গোলাম রসুল : অ্যাকচুয়ালি, যদি বাজারের কথা বলেন তাহলে কিন্তু আমরা পরিবর্তন দেখছি না। কারণ পণ্যমূল্যে এখনো এর প্রভাব পড়েনি। সরকার চেষ্টা করছে কিন্তু এখনো পুরোপুরি সাকসেস হয়নি।
দেশ রূপান্তর : আগের রেজিমে এমপিদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য ছিল, কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ দাঁড়িয়ে ছিল যারা সিন্ডিকেট মেইনটেইন করত। কিন্তু এখন তো পলিটিক্যাল সিন্ডিকেট নেই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না।
গোলাম রসুল : আমরা রিসেন্ট ভোজ্য তেল নিয়ে যা দেখলাম, কয়েকদিন আগে ডিম নিয়ে দেখলাম। এই ভোজ্য তেলের দাম দেখেন। আমাদের কয়েকটা এসেনশিয়াল খাদ্যদ্রব্যের বড় অংশ কিন্তু এস আলম গ্রুপ ইম্পোর্ট করে বাজারটাকে নিয়ন্ত্রণ করত। এখন এস আলম গ্রুপের এস আলম চলে গেছে কিন্তু তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিন্তু রয়ে গেছে, তারা তো ব্যবসা করছে। এ রকম আরও অনেক আছে। আমরা দেখে আসছি যে আমাদের খাদ্যপণ্য আমদানি বাণিজ্য এবং পাইকারি বাজার কতগুলো বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং আছে। তারা ইচ্ছা করলেই এটাকে ম্যানিপুলেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়ে টাকা তুলে নিতে সক্ষম। এখন সরকারে পটপরিবর্তনের ফলেও আমরা এ থেকে বের হতে পারছি না। বাজার যারা আগে নিয়ন্ত্রণ করত, যেটাকে আমরা সিন্ডিকেট বলি তারা কিন্তু এখনো উধাও হয়ে যায়নি। তারা এখনো কার্যকর। ফলে আমরা হঠাৎ করেই দেখলাম ৩ দিন আগে থেকে তেল উধাও হয়ে গেল। তারপর তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে তেল চলে এলো। ডিমের ক্ষেত্রেও তাই দেখলাম। তার মানে ব্যবসায়ীদের একটা কারসাজি এখনো রয়ে গেছে।
দেশ রূপান্তর : তেলের সাম্প্রতিক ঘটনায় আমার একটা পর্যবেক্ষণ আছে। সয়াবিনের ব্যবহার কমিয়ে সরিষার তেলের ব্যবহার বৃদ্ধিতে পতিত সরকারের একটা পলিসি ছিল। এজন্য সরিষার চাষে সহায়তাও করা হয়েছিল। আর সয়াবিন আমদানির এলসিও কম খোলা হয়েছিল। বাজারে কিন্তু সরিষার তেল আছে। এই পলিসির কথা তো আমলাদের জানার কথা। তারা জানাননি কেন? ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে তড়িঘড়ি করে সয়াবিনের দাম না বাড়ালেও তো পারত।
গোলাম রসুল : খুব চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। আমরা দেখেছি আমাদের নর্থ বেঙ্গলে প্রচুর এরিয়ায় এই সরিষার চাষ করা হচ্ছে। সরিষার উৎপাদন বাড়িয়ে আমরা যদি অ্যাটলিস্ট ভোজ্য তেলের আমদানি একটু কমাতে পারি সেটা আমাদের জন্য খুবই উপকারী হয়। এখন যেটা আপনি বললেন, আসলে আমাদের সমস্যা যেটা আগেও ছিল, এখনো দেখছি ‘ল্যাক অব কো অর্ডিনেশন অ্যামং দ্য মিনিস্ট্রি’। কারণ হয়তো আমাদের এগ্রিকালচার মিনিস্ট্রিতে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আমরা সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাব। কিন্তু এই কো-অর্ডিনেশনটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের, সেটা তো দেখছি না। আপনি যদি ইনফ্লেশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান এটা কিন্তু একক কোনো মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে সম্ভব না। আপনি যদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথা বলেন এটা তো ব্যাসিকেলি কো-অর্ডিনেটর, রেগুলেটরি মিনিস্ট্রি, এরা তো উৎপাদনে জড়িত না। এখন আমাদের খাদ্যদ্রব্যের যেগুলো উৎপাদন হয় সেটার সঙ্গে জড়িত আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়, আমাদের লাইভস্টক মন্ত্রণালয়, আমাদের ফিশারিজ মন্ত্রণালয় আরও অন্যান্য মন্ত্রণালয়। এখন ওদের সঙ্গে ওদের যদি একটা নিয়মিত কো-অর্ডিনেশন, যোগাযোগ না থাকে তার ফলে একটা পলিসি গ্যাপ তৈরি হয়ে যায় এবং এই গ্যাপের সুযোগটা কিন্তু ব্যবসায়ীরা নেয়। আপনি যথার্থই বলেছেন। আমাদের আন্তঃমন্ত্রণালয়ে একটা পলিসি কো-অর্ডিনেশন হওয়া দরকার। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির মতো জিনিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে। এটা যদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আমরা এককভাবে দায়িত্ব দিই তাহলে চেষ্টা করেও সেটা সম্ভব না।
দেশ রূপান্তর : আপনি বলেছিলেন, খাদ্য কখনো কখনো অস্ত্র হয়ে যায়। আপনি জানেন সরকার পতনের পর আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এ রকম টানাপড়েন চলছে আরকি। এটার প্রভাব বাজারে পড়ার শঙ্কা কতখানি?
গোলাম রসুল : এটা কিন্তু আমাদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটা নতুন রিস্ক। ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমাদের যে ট্রেডিং সম্পর্ক, ইন্ডিয়া আমাদের ইম্পর্টেন্ট ট্রেডিং পার্টনার। বিশেষ করে খাদ্যের ক্ষেত্রে। রিসেন্ট পলিটিক্যাল চেঞ্জের ফলে আমাদের সম্পর্কটা আসতে আসতে শীতল হয়ে যাচ্ছে। সেটার প্রভাব কিন্তু অলরেডি আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়তে শুরু করেছে। কোনো কোনো বন্দরে মালামাল খালাস হচ্ছে না, ট্রাকের পর ট্রাক বসে আছে।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু গভর্নমেন্টের কি অল্টারনেটিভ সোর্সিংয়ের চেষ্টা দেখছেন?
গোলাম রসুল : গভর্নমেন্ট কিন্তু ট্রাই করছে আমাদের ইম্পোর্টকে ডাইভারসিফাই করতে। ইন্ডিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্য দেশ থেকে আনার জন্য। যেমন গভর্নমেন্ট ট্রাই করছে অনিয়ন এবং পটেটো অন্য দেশ থেকে আনার জন্য। আমাদের ইম্পোর্টের সোর্সকে ডাইভারসিফাই আমাদের করতে হবে। এটাও যে খুব সহজ তা কিন্তু না। এখানে আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। আমরা যদি ডাইভারসিফাই করি সেটার নেগেটিভ প্রভাব আমাদের মূল্যস্ফীতিতে পড়বে। কারণ ইন্ডিয়া থেকে পণ্য আনার খরচ আর অন্যত্র থেকে আনার খরচ এবং প্রক্রিয়া এক হবে না। অন্য সব বাদ দিয়ে যদি কেবল ভৌগোলিক বিষয়টা মাথায় রাখেন, সে ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। তারপর পরিমাণগত সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু আমরা তো ইন্ডিয়া থেকে ফ্রি আনছি না। সেই হিসেবে তারও তো লাভের বিষয় আছে। মানে এত বাজার হারানোর রিস্ক সে কেন নেবে?
গোলাম রসুল : এখানে আসলে বিজনেস ইন্টারেস্ট। আমাদের ইন্টারেস্ট আছে, তাদের ইন্টারেস্ট হচ্ছে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু, অনেক সময় দেখি আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো না থাকলে আমি চাই আপনাকে একটু বিপদে ফেলতে। তাহলে আমি কিন্তু এখানে বিক্রি না করে দূরে বিক্রি করেও যে আপনাকে একটু বিপদে ফেলে দিতে চাইব। কারণ আমার এমন একটা জিনিস আপনি নেন, যেটা আপনার প্রয়োজন।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু, আমরা তো কিনে নিচ্ছি আর ইন্ডিয়া ন্যারেশন তৈরি করছে যে আমি তোমাদের দিচ্ছি।
গোলাম রসুল : আসলে আমাদের নির্ভরতা ইন্ডিয়ার ওপর অনেক, এটা কমাতে হবে। অন্য জায়গা থেকে পণ্য আনতে হলে আমাদের অ্যাডভান্সড প্ল্যানিং দরকার। অন্য জায়গা থেকে আনতে গেলে সময় বেশি দরকার পড়ে, আমাদের ট্রান্সপোর্ট কস্ট বেশি লাগে, অনেক সময় আমদানিটা বিলম্বিত হতে পারে, আমদানিতে অনেক সময় অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। আমাদের ফুড সাপ্লাই চেইনে ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমাদের একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা নিরসনের জন্য এখনই কাজ করা দরকার। কারণ আমাদের সামনে রমজান আসছে। রমজানের বাজারের প্রভাব সরকারের ওপর পড়ে। এজন্য সরকারকে এখন থেকে একটা ব্যাপক প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিয়ে এবং প্রাইভেট সেক্টরকে এনগেজ করে আগাতে হবে।
দেশ রূপান্তর : রমজানের বাজার নিয়ে তো খুবই উদ্বেগ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়েই তো দেখা যায়, রমজান এলে মুসলিম সমাজের ব্যবসায়ীরা শাইলকের মতো হয়ে যায়। এখন তো বিশেষ সরকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
গোলাম রসুল : এটা খুবই দুঃখের বিষয় এবং আমরা প্রতি বছরই দেখছি। অন্যান্য দেশে দেখি যখন বড় বড় ফেস্টিভ্যাল আসে সবাই মালামাল কম দামে ডিসকাউন্টে বিক্রি করে সেখানে আমাদের দেশে পুরো উল্টা, যে জিনিসের দাম ৫০ টাকা সেটা ২০০ টাকা হয়ে যাবে। এটা আমরা প্রতি বছর দেখে আসছি। আমরা আশা করি এবার এমন হবে না। আমাদের বাণিজ্য উপদেষ্টাও খুব চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘আমি চেষ্টা করব যে রমজান মাসে যেন বাজারে কোনো কিছুর দাম না বাড়ে। আমরা আগের অভিজ্ঞতা থেকে যেটা দেখছি যে, অভিজ্ঞতা খুব ভালো না।’
দেশ রূপান্তর : আগে যে আপনি বললেন, সেই প্রাইভেট সেক্টরকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ভরসা কি রাখা যায় বলে মনে করেন?
গোলাম রসুল : আমরা যদিও দেখছি যে প্রাইভেট সেক্টর বাজারকে ম্যানিপুলেট করে, বাজারকে অস্থিতিশীল করে একটা ব্যবসা করে নেয়। এখন আমাদের মতো এত বড় একটা দেশে তো এই প্রাইভেট সেক্টরের কাজটা সরকার করতে পারবে না। কারণ আমাদের যে বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা অর্থাৎ ফুড সাপ্লাই চেইন সেটার প্রোডাকশন থেকে শুরু করে ট্রান্সপোর্টেশন, ডিস্ট্রিবিউশন, মার্কেটিং এসব কাজের সঙ্গে প্রাইভেট সেক্টর জড়িত। এবং তাদের প্রতি ক্ষেত্রে রুল আছে। এই রুল তো আর অন্য কেউ পালন করতে পারবে না। প্রাইভেট সেক্টরকে নিয়েই কাজ করতে হবে, তাদের আস্থায় নিয়েই কাজ করতে হবে। মনোপলিটা ভাঙার জন্য চেষ্টা করতে হবে, সেটাই হলো আসল কথা। মনোপলি বা জিওপলি যেটা এখন চলছে কয়েকটা কোম্পানি মিলে কারসাজিটা করে, কারণ পাওয়ার তাদের হাতে চলে গিয়েছিল। যার ফলে তারা ইচ্ছা করলেই যখন তখনই যা-তা করতে পারত। এখন সরকারকে খুব ইন্টেনশনালি, স্ট্র্যাটেজিক্যালি কাজ করতে হবে সেটা হচ্ছে এই মার্কেট পাওয়ারটা ভেঙে দেওয়া। যাতে আরও নতুন নতুন ব্যবসায়ী গ্রুপকে এনগেজ করা এই সমস্ত ব্যবসার ক্ষেত্রে, তাদের সাপোর্ট করা টেকনিক্যালি বা ফিনান্সিয়ালি, যাতে আরও নতুন নতুন লোক আসে এবং তাদের মধ্যে কম্পিটিশন বাড়ে। মার্কেট মেকানিজমে কম্পিটিশন বাড়াতে হবে।
দেশ রূপান্তর : শীতের শুরুতে শাক-সবজির সরবরাহ আছে কিন্তু দাম কমছে না কেন?
গোলাম রসুল : শীতের শাক-সবজি বাড়ছে কিন্তু দাম কমছে না। এখানে একটা জিনিস আমাদের খেয়াল করতে হবে যে, আমাদের প্রোডাকশন কস্ট বেড়ে গেছে। ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট আগের তুলনায় বেশি। দ্বিতীয় হচ্ছে চাঁদা বা বিভিন্ন গ্রুপের চাঁদা বা ইত্যাদি ইত্যাদি। আগে দেখতাম পলিটিক্যাল, বিজনেস, পুলিশের নেক্সাসকে একটা ট্রাক এক জায়গা থেকে মুভ করতে হলে টাকা দিতে হতো। এখন সরকারের পটপরিবর্তনের ফলে দেখছি শুরুতে না থাকলেও এখন আবার চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। উৎপাদন খরচ, লেবার কস্ট এবং সবকিছু মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে সেটাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু পুলিশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এটায় আসলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। গভর্নমেন্টকে প্রতিটি ইম্পোর্টেড কমোডিটি ধরে ধরে এর স্টক কী আছে, সাপ্লাই কী, এর কত ঘাটতি কী আছে সব কিছু ধরে ধরে দেখতে হবে।
দেশ রূপান্তর : এখন পর্যন্ত এই যে ভোক্তা অধিকার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এক লাখ, দুই লাখ, দশ লাখ টাকা জরিমানা করে। এর বাইরে কোনো বড় ব্যবসায়ীকে বড় সাজা পেতে দেখলাম না, লাইসেন্স বাতিল করতে দেখলাম না। এক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?
গোলাম রসুল : এটা আপনি একদম ঠিকই বলেছেন। আপনার মনে আছে বোধহয় ২০২২ সালে একজন কৃষি অফিসারের ঘরে ৩০০ কি ১৫০ লিটার তেল পেল, তাকে ধরে এনে অ্যারেস্ট করে বিরাট শাস্তি দেওয়া হলো। কিন্তু যাদের গুদামে হাজার হাজার লিটার আছে সেই বড় ব্যবসায়ীরা কিন্তু ধরা পড়ছে না। আসলে আমরা যে তদারকির কথা বলছি সেটাই ভিন্নভাবে দরকার। যারা বড় প্লেয়ার আছে ম্যানিপুলেট তো তারা করে, এই এক-দেড়শো লিটার দিয়ে তো পুরো দেশের বাজার ম্যানিপুলেট করা সম্ভব না। তো যারা এ রকম রিফাইনারি চালাচ্ছে, যারা তেল আমদানি করছে এদের ওপরে নজরদারি বাড়ানো দরকার। তদারকিটা সেখানে করতে হবে। আমরা তদারকি দেখি সেই কারওয়ান বাজারে, এখানে সেখানে। দিস ইস অ্যাকচুয়েলি নট মাচ এফেক্টিভ। আমাদের একটা কম্পিটিশন কমিশন আছে, আই ডোন্ট নো হোয়াট দে আর ডুয়িং অ্যাকচুয়েলি। আমি তেমন ভূমিকা দেখছি না, দুই একটা মামলা-টামলা করছে, আছে এটুকুই শুনেছি। কিন্তু এই মামলার কোনো রেজাল্ট আমি এখনো দেখিনি। আমার চোখে তো কখনো পড়েনি যে এমন একটা কারণে বড় কোনো ব্যবসায়ীর শাস্তি হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো অ্যান্টি ট্রাস্ট ল’ আছে, কম্পিটিশন পলিসি আছে, এগুলো আসলে প্রোপারলি ফাংশন করছে বলে আমার মনে হয় না। ওখানে যারা আছে তাদের নিয়েও সন্দেহ আছে।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
গোলাম রসুল : ঠিক আছে। আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়