বিজয় দিবস ফিরে এলে কেমন অনুভূতি হয়?
প্রতাপ শংকর হাজরা : মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। ৫৩ বছর হয়ে গেল বিশ্বাসই হতে চায় না। আমার আরমানিটোলার বাড়িটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল ২৬ মার্চ। পরে বাড়িতে ঢোকার পর অনেকেই বলছিল আমার বাসায় নাকি অস্ত্র পাওয়া গেছে! পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকের আচরণে মনে হচ্ছিল তারা আমাকে বাড়িতেই থাকতে দিতে চায় না। আমরাও ওখানে থাকলাম না। ফরিদপুরের মোহন মিয়া সাহেবের ছেলে আকমল ও হকির সাদেক (আব্দুস সাদেক) আমাকে নিয়ে গেলেন আকমলের দুলাভাইয়ের বাসায়। সেখানে দু’দিন থাকলাম। তবে সেই জায়গাটাও আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল না। অনেক বেশি আর্মি যাতায়াত করছিল। একদিন সকালে আমাদের মিটফোর্ড ঘাটে পৌঁছে দিল। খেয়াপাড় করে চলে গেলাম জিঞ্জিরায়। সেখান বাবার এক পরিচিত লোকের বাসায় গেলাম। আমরা তখন ছিলাম প্রায় ১৫-১৬ জন মানুষ। বাবার পরিচয় পেয়ে আমাদের খুব আপ্যায়ন করলেন, আশ্রয়ও দিলেন। কিছু টাকাও ধার দিলেন। এরপর গ্রামে গেলাম (বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার দোগাছি গ্রাম)। গ্রামে মাসখানেক থাকার পর কয়েকজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার দেখা পাই। সেখানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমির (শাফি ইমাম রুমী) সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমরা আগরতলা দিয়ে বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি ২৬ এপ্রিল। পরে চলে যাই কলকাতায়।
তখন তো আপনি প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার?
প্রতাপ : মোহামেডানে খেলতাম। শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড় ছিলাম নাকি নিচু পর্যায়ের, বলতে পারব না। মোহামেডান তখন প্রথম বিভাগ লিগের শীর্ষ দলগুলোর একটি। ১৯৬৩ সালে আমি প্রথম মোহামেডানে আসি। ১৯৭৭ সালে খেলা ছাড়লেও এখনো মোহামেডানের সঙ্গে আছি।
কলকাতা যাওয়ার পর কী করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের একজন হয়ে গেলেন?
প্রতাপ : আগরতলায় গিয়ে দেখি আমাদের দেশের অনেক শীর্ষ খেলোয়াড় সেখানকার স্থানীয় লিগে খেলছে এনায়েত, নওশের, কায়কোবাদসহ ১৮-২০ জন। তাদের সঙ্গে গল্প করে চলে যাই কলকাতায়। সেখানে কয়েকজন নিয়মিত আড্ডা দিতাম থিয়েটার রোডে। একদিন একটা ছেলে এসে বলল যে শামসুল হক এমপি আমাকে দেখা করতে বলেছেন। তক্ষুনি তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। অনেক কথার পর তার কাছ থেকেই জানলাম, ভারতের মুসলিম সমাজের একটা ভুল ধারণা ভারত সরকার হিন্দুদের নিয়ে একটা চক্রান্ত করছে পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার জন্য। এই ধারণাটার পরিবর্তন আনতে কিছু করতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতি একটা অনুরোধ এসেছে। এ জন্যই শামসুল হক সাহেবের নেতৃত্বে একটা কমিটি গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি নামে। সেই সমিতির দ্বিতীয় সভায় আমাকে যেতে বলা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যে ফুটবল দলটা গড়া হবে তার দায়িত্ব নিতে হবে। তখন শাসমুল হক সাহেব আমাকে, পিন্টু ভাইকে (স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু) ও ননী বসাককে (দলের কোচ) সেই কমিটির সদস্য করে নেন। সিদ্ধান্ত হয় একটা বাজেট তৈরি করতে হবে। আমি বললাম আগরতলা থেকে খেলোয়াড় আনতে হবে। উনি রাজি হলেন। আগরতলা থেকে সেই খেলোয়াড়দের আনতে গিয়ে একটা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। আমরা খেলেছি ‘জয় বাংলা একাদশ’ নামে আগরতলা একাদশের বিপক্ষে। ম্যাচটা ২-০ গোলে হেরেছিলাম আমরা। সেখান থেকে কলকাতা এসে পার্ক সার্কাস মাঠে ট্রেনিং শুরু হয়। কিছুদিন পর সেটাও স্থানীয়দের বাধায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমরা বিভিন্ন সময় রবীন্দ্র সরোবর মাঠসহ বিভিন্ন মাঠে ট্রেনিং করেছি। এরপর তো ইতিহাস মোটামুটি সবার জানা। আমরা প্রথম ম্যাচ খেলতে যাই কৃষ্ণনগরে। সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম। সোনার বাংলা গান গাইলাম।
দেশ বিজয়ের ৫৩ বছর পার করে ৫৪-তে পা রেখেছে। এই স্বাধীনতার পেছনে তো আপনাদেরও অনেক অবদান?
প্রতাপ : অবদান কি না জানি না। আমার ব্যক্তিগত মত হলো আমরা দেশকে সহায়তা করতে গিয়ে কিন্তু ভারত সরকারকেই প্রকারান্তরে সাহায্য করেছি। কারণ ভারতের মুসলিম সমাজ ভারত সরকারকে বিশ্বাস করছিল না তখন। তাদের সন্দেহ ছিল, আসলেই পাকিস্তান আর্মি বাংলাদেশে ক্র্যাকডাউন করেছিল কি না। সেখানে খেলে আমরা প্রমাণ করেছিলাম পাকিস্তান আর্মিই আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
জাকারিয়া পিন্টু অধিনায়ক আর আপনি সহ-অধিনায়ক। অধিনায়ক না ফেরার দেশে চলে গেলেন কদিন আগে। এখন তো অধিনায়কের সব দায়িত্ব আপনার কাঁধে?
প্রতাপ : এ কারণেই তো আপনারা বলার সঙ্গে সঙ্গেই কথা বলছি এসব নিয়ে। পিন্টু ভাই বেঁচে থাকতে তো আমাকে দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হতো না। আমাদের তো সেভাবে কোনো কর্মকা- নেই। এই ডিসেম্বর মাস এলে কিছুটা তৎপর হই, এই আর কি।
মাঠ ও মাঠের বাইরে পিন্টু-হাজরা জুটি ভীষণভাবে আলোচিত। জুটিটা ভেঙে গেল...
প্রতাপ : জাকারিয়া পিন্টুর না থাকাটা আমি প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করি, ডিসেম্বর মাসে তো ভীষণভাবে মনে করি। এই যে আপনাদের চাপগুলো পিন্টু ভাই আগে সামলাতেন, এখন আমাকে সামলাতে হয়। তবে জুটি ভেঙেছে বলে মনে করি না। হয়তো একটু একা হয়ে গেলাম। তার কিছু দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাল।
পিন্টু ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ছিল পুরো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে স্বাধীনতা পদক পেতে দেখতে। কেবল তিনি নন, এই আক্ষেপটা তো দলের সবার মধ্যেই আছে?
প্রতাপ : আমার একটা ব্যক্তিগত মত হলো যিনি পুরস্কার দেন, তিনি দাতা। যে নেয় সে গ্রহীতা। গ্রহীতার কী কোনো চাহিদা থাকতে পারে, যদি চাহিদা থাকে, তবে তো সে ভিক্ষুক হয়ে গেল। যারা দাতা, এটা তো তাদের ব্যাপার। এখানে দাতাদের সংকীর্ণতা না উদারতা, এত বছরে আমি কখনো খোঁজ করতে যাইনি।
তারপরও কী আপনার ব্যক্তিগত কোনো আক্ষেপ নেই?
প্রতাপ : না। আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বাংলাদেশ সরকার যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সার্টিফিকেট দিয়েছে, ভাতা দিচ্ছে, এতেই আমি গর্বিত। মুক্তিযোদ্ধার ওপরে কোনো কিছু থাকতে পারে না।
এই প্রজন্ম আরেকটি স্বাধীনতার কথা বলছে-
প্রতাপ : এটাকে স্বাধীনতা বলব না, এটা হলো একটা সংস্কার। এটা একটা স্থানীয় বিদ্রোহ, জনগণের বিদ্রোহ, জনআন্দোলন। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করা, আর অন্য পাড়ার সুসজ্জিত গু-াদের সঙ্গে যুদ্ধ করা এক জিনিস নয়। আমরা একটা সুসজ্জিত আর্মির সঙ্গে একাত্তরে যুদ্ধ করেছি। শক্তিশালী আর্মির বিরুদ্ধে ৯ মাস টানা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছি। আর এটা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তাদের হটাতে আন্দোলন করেছে। কারণ তারা দুষ্কৃতকারী ছিল। কবি শামসুর রাহমানের একাত্তরে লেখা কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’র শেষ লাইনটা হলো ‘স্বাধীনতা তুমি... যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’। এখন স্বাধীন যখন হয়ে গেছি, যে যেমন ইচ্ছে কবিতার খাতায় লিখব।
আপনি তো হকিটাও ভালো খেলতেন। কোন পরিচয়টা বলতে ভালো লাগে ফুটবলার প্রতাপ নাকি হকি খেলোয়াড় প্রতাপ?
প্রতাপ : এখানে আমার উত্তর দুই রকম। জনগণের কাছে আমি ফুটবলের প্রতাপ, তবে আমার কাছে মানে প্রতাপের কাছে হকির প্রতাপ।
তারচেয়ে বড় পরিচয় কি মুক্তিযোদ্ধা?
প্রতাপ : মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা তো আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাই বলে এটাকে জাহির করার পক্ষে আমি নই। জনতা ব্যাংকে যখন যোগ দিই, তখন ফরমে লিখেছিলাম, আমি মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়গুলোতে সম্পৃক্ত ছিলাম। লিখিনি- আমি মুক্তিযোদ্ধা। বলতে পারেন আমি কোটায় চাকরি নিইনি।০