বিশ্ব জুড়ে প্রযুক্তির হাত ধরে যখন সবকিছু আরও সহজ হচ্ছে, তখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে এর অন্ধকার দিকও। আজকালের শিশু-কিশোরদের যারা অনলাইন দুনিয়ায় সময় কাটাতে ব্যস্ত, তারাই যে প্রযুক্তি জায়ান্টদের গোপন ব্যবসায়িক স্বার্থের শিকার হতে পারে, তা ভাবনারও বাইরে। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশনের তদন্তে গুগল ও মেটার এমন একটি গোপন বিজ্ঞাপন চুক্তির কথা সামনে এসেছে, যা শুধু নীতিমালা ভঙ্গের উদাহরণ নয়, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তুলে ধরেছে নৈতিকতার প্রশ্ন।
গোপন এই চুক্তির মাধ্যমে গুগলের ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে মেটার ইনস্টাগ্রামের বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছিল, আর এসব বিজ্ঞাপনের মূল লক্ষ্য ছিল ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর ব্যবহারকারীরা। গুগলের নিজস্ব ‘টিন সুরক্ষা নীতি’ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ওপর ব্যক্তিগতকরণ করা বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। অথচ বাস্তবে সেই নীতিমালা ভেঙেই ব্যবসায়িক স্বার্থে চুক্তি করেছিল তারা।
গোপন চুক্তির এই খবর প্রথম ফাঁস হয় গত আগস্টে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর একটি তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুগল এবং মেটার মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল, যার মাধ্যমে ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে ইনস্টাগ্রামের বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছিল। ব্যবহারকারীদের যাদের পরিচয় ‘অজানা’ ক্যাটাগরিতে পড়ে, তাদের লক্ষ্য করেই এই বিজ্ঞাপন চালানো হয়। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘অজানা’ ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই ছিল কিশোর।
প্রতিবেদনটি সামনে আসার পরপরই ইউরোপীয় কমিশন দ্রুত তদন্তে নামে। অক্টোবর মাসে গুগলকে নির্দেশ দেওয়া হয় তাদের অভ্যন্তরীণ ইমেইল, চ্যাট এবং অন্য সব যোগাযোগের রেকর্ড জমা দিতে। গুগল বরাবরের মতোই নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গুগলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘আমাদের টিন সুরক্ষা নীতি প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রির অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এগিয়ে। তবে আমরা সবসময় নীতিমালা আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছি।’ মেটার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, মেটার এই নীরবতা তাদের দীর্ঘদিনের কৌশল, যতদিন সম্ভব চুপ থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা।
বিশ্ব জুড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিজ্ঞাপনের অন্যতম বড় গ্রাহক হলো কিশোররা। এ বয়সে তরুণরা অনলাইন দুনিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অধিক সময় ব্যয় করে। গুগল ও মেটার মতো কোম্পানিগুলো সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের বিজ্ঞাপন ব্যবসাকে শক্তিশালী করছে। যদিও তারা মুখে বলে, ‘কিশোরদের সুরক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার,’ কিন্তু বাস্তবে তাদের কার্যক্রমই প্রমাণ করে ব্যবসায়িক স্বার্থই তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রযুক্তির জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এসব প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারে। তারা কারা, কোথায় থাকে, কী পছন্দ করে সবকিছুই তাদের নজরে থাকে। একবার এই তথ্য হাতিয়ে নিতে পারলেই বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য সেই কিশোররাই পরিণত হয় সবচেয়ে লাভজনক গ্রাহকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে বেশ কিছু কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট উল্লেখযোগ্য। গোপন চুক্তির মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো কীভাবে আইনকে ফাঁকি দিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তদন্তে যদি গুগল ও মেটার এই গোপন চুক্তির সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন ও আরও কঠোর নিয়ম প্রণয়নের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এর আগেও গুগল ও মেটা নানান অভিযোগে বিপুল অঙ্কের জরিমানা গুনেছে। ২০১৯ সালে গুগলকে ১.৫ বিলিয়ন ইউরো জরিমানা করা হয় অ্যান্টিট্রাস্ট মামলায়। মেটাও ফেসবুকের তথ্য গোপনীয়তা লঙ্ঘনের কারণে একাধিক মামলা ও জরিমানার মুখে পড়েছে।
গুগল ও মেটার এই ঘটনা কেবল একটি কোম্পানির গোপন চুক্তির কথা নয়, এটি প্রযুক্তির অন্ধকার দিকের প্রতিচ্ছবি। অল্পবয়সী শিশু-কিশোর যারা অনলাইনে সময় কাটাচ্ছে, তারা নিজেরাও জানে না যে তাদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন বিজ্ঞাপন ও কনটেন্টের অতিরিক্ত চাপ কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এটি উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের দায়িত্ব কেবল সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত রাখা নয়; বরং তাদের প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন করাও প্রয়োজন।
গোপন চুক্তির এই ঘটনা বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কিশোরদের গোপনীয়তা রক্ষা ও নৈতিকতার প্রশ্নে অবহেলা ভবিষ্যতে তাদের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের তদন্ত কেবল গুগল-মেটার জন্য নয়, বরং অন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা।