দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়া জুড়ে মধ্যবিত্তের উত্থান দেখা যায়। কলোনিগুলো ভেঙে নতুন নতুন দেশ স্বাধীন হচ্ছে দুনিয়া জুড়ে তখন নতুন আশা। শিক্ষার বিস্তার, প্রযুক্তির উন্নয়ন, বিশ্বায়ন মিলিয়ে নতুন দুনিয়ার স্বপ্ন। বিত্তে মাঝারি হলেও আশায় বড় মধ্যবিত্ত এই স্বপনের সারথিহয়ে ওঠে। মধ্যবিত্তের সম্পদ ছিল তার শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অনুরাগ, তা ব্যবহার করে সামাজিক সোপান বেয়ে উন্নতি। মধ্যবিত্তের আরেকটা বড় সুবিধা ছিল, নিম্নবিত্তের মতো তাকে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা করতে হতো না। শিক্ষিত মানুষ, মাসকাবারি চাকরি, মাস গেলে মোটামুটি খেয়ে-পরে চলার একটা নিশ্চয়তা এই ছিল মধ্যবিত্তের সাধারণ একটা ছবি। উচ্চবিত্তের মতো বিলাসী জীবন না কাটাতে পারলেও পাতে ভাত-মাছটা নিয়মিতই ছিল। এই কারণেই তারা ছিলেন বিত্তের তালিকায় মধ্যে। ধীরে ধীরে, অবশ্য বিশ্ব জুড়েই অবস্থার পরিবর্তন হয়, বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে। মধ্যবিত্ত এক সময় মাছে-ভাতে বাঙালি এই আয়েশ ছেড়ে ডাল-ভাতে বাঙালি হয়ে পড়ে। আর এখন আর্থিক বৈষম্য আরও প্রকট হতে থাকায় মধ্যবিত্ত ডাল-ভাত জোগাড় করতেও হিমশিম খাওয়া শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত শব্দটিই চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়।
দেশ রূপান্তরের খবরে জানা গেছে, দেশে প্রায় তিন বছর ধরে গড় মজুরির চেয়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেশি। বাজারের তালিকা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে অধিকাংশ পরিবারে। পর্যাপ্ত খাবার কিনতে না পারায় অধিকাংশ পরিবারই আছে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে। বিশেষ করে এটি প্রভাব ফেলছে শিশুদের পুষ্টিতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ; মজুরি বেড়েছিল ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম হওয়ার তথ্য দিচ্ছে বিবিএস। সবশেষ নভেম্বর মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আর জাতীয় মজুরি হার ছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। এর মানে মূল্যস্ফীতি যে হারে বেড়েছে, মজুরি সেই হারে বাড়েনি।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ায় শিশুসহ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের খরচ কমাতে হচ্ছে, এমনকি খাবার কমিয়ে দিতে হচ্ছে। পাত থেকে মাছ-মাংস তো কমে গেছেই, শীতের ভরা মৌসুমে শাকসবজি পর্যন্ত নিয়মিত উপযুক্ত পরিমাণে কিনতে পারছে না স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীরা। দেশ রূপান্তরকে তেমনি একজন বলেন, নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি মাত্র মাস চারেক হলো। যে টাকা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে সংসার চালানো সত্যিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ২৫ হাজার টাকার মধ্যে বাসা ভাড়ায় চলে যাচ্ছে ১৩ হাজার টাকা। বাকি ১২ হাজার মায়ের ওষুধ, বাচ্চার টিউশন ও সংসারের খরচ চালানো অনেক বেশি কঠিন বিষয়। এ রকম অবস্থা লাখ লাখ মধ্যবিত্তের।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে মানিয়ে চলার, কম খাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব আছে। দীর্ঘসময় যথাযথ ক্যালরির অভাব মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। তারা একদমই সঠিকভবে বেড়ে উঠে না।
মধ্যবিত্তের পাঁচালী কবিতায় শামসুর রাহমান বলেছিলেন,
‘একি মরীচিকা বিলাসে মজেছি
যুগসন্ধ্যায় যৌথ ভ্রমে,
বিস্মৃত কিছু প্রাণীর মতোই
আমরা লুপ্ত হচ্ছি ক্রমে।’
কবি হয়তো রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথাটা বলেছিলেন। তবে তিনি হয়তো ভাবেননি, এমন এক সময় আসবে যখন মধ্যবিত্ত খাবারের অভাবে লুপ্ত হয়ে যাবে। এই লুপ্ত হওয়া বৈষম্যের এক বড় ফলাফল।