আমাদের শরীরের জন্য ফ্যাটি অ্যাসিড একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান, যা তেল, চর্বি, নানা ধরনের বাদাম, সামুদ্রিক মাছ, দুধ, ডিম এমনকি শাকসবজিতেও থাকে। এগুলো মানব শরীরে প্রয়োজনীয় লিপিড বা ফ্যাটি যৌগ সরবরাহ করে, যা কি না আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য বেশ প্রয়োজন। এই লিপিড আমাদের কোষের ঝিল্লির অংশ এবং এটি আমাদের কোষের ভেতরের অংশের সঙ্গে বাইরের অংশের দরকারি রাসায়নিক যোগাযোগকে নিয়ন্ত্রণ করে। লিপিড আমাদের শরীরে শক্তি সঞ্চয় করতে, শরীরের নানা অংশের কার্যকলাপ ঠিক রাখতে, ভিটামিন শোষণ করতে এবং প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি করতে সহায়তা করে। তবে কিছু লিপিড শরীরে বেশি থাকাটা ক্ষতিকারক। সরিষার তেল আমাদের শরীরে লিপিড সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারতীয় উপমহাদেশ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে সরিষার তেলের যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরিষার তেলের একটি উপাদানকে (ইউরিসিক অ্যাসিড) বিষাক্ত বলে দাবি করে। মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন সরিষার তেলকে ভোজ্যতেল হিসেবে অনুমতি দেয়নি, কারণ এতে ‘ক্ষতিকর ইউরিসিক অ্যাসিড’ রয়েছে। তবে গত বছরের একটি পর্যালোচনা কতিপয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে বলছে যে ইউরিসিক অ্যাসিড একটি বিষাক্ত পদার্থ হলেও ওই গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর চালানো হয়েছে। যা হোক, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা দাবি করেনি যে, ইউরিসিক অ্যাসিড মানুষের হৃৎপি-ের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে খাঁটি সরিষার তেল এবং তেলের Extract শরীরের নানাবিধ প্রদাহ এবং ব্যথা কমাতে, ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি-হ্রাস করতে এবং চুল ও ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।
দেশে হঠাৎই সরিষার উৎপাদন বেড়েছে
যদিও সরিষা এই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন একটি তৈলবীজ হিসেবে চাষ করা হচ্ছে (খ্রিস্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দ থেকে), বাংলাদেশে বিশেষ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এর ফলন বাড়ানো হয়েছে মাত্র তিন বছর আগে। এখন অনেক দোকানেই ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সরিষার তেল দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে, গত তিন বছরে বিদেশ থেকে ৮,৪০০ কোটি টাকার ভোজ্যতেল কম আমদানি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা দেশে সরিষার উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার কারণে সয়াবিন ও অন্যান্য তেলের আমদানি কমে যেতে পারে। এখানে ডলারের সংকটও একটি ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
গত তিন বছর আগে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২৭৮ কোটি টাকার ‘তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এটি এখন (২০২০-২০২৫) ২৫০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে করে দেশে সরিষার উৎপাদন যথেষ্ট বেড়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত শস্যবিন্যাসে স্বল্পমেয়াদি তেল ফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএআরআই ও বিনা কর্র্তৃক উদ্ভাবিত তেল ফসলের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৌ-চাষ অন্তর্ভুক্ত করে তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। ফলে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়বে ও ভোজ্যতেল আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাবে।
সরিষা উৎপাদনে মৌমাছি কর্র্তৃক পরাগায়নের প্রয়োজন হয়। এ জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মোট পাঁচ হাজার আধুনিক মৌ-বাক্স কৃষকদের মধ্যে বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে ২,০০০ বাক্স বিতরণ করা হয়েছে। মৌমাছি চাষের কারণে দেশে এ বছর প্রায় ২০ হাজার টন মধু উৎপাদন হতে পারে বলে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকার মধু ভারতে পাচার হয়ে একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের নামে বাংলাদেশে আবার আমদানির মাধ্যমে ফিরে আসছে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক রাজিয়া সুলতানা ও অন্যদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিনাসরিষা-৯ উৎপাদন কৃষকদের জন্য লাভজনক। এই সরিষাটি চাষ করে কৃষক ভালো ফলন পান অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয় প্রায় ১.৪ টন। গবেষণাটি Asian Journal of Agricultural Extension, Economics and Sociology ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এই সরিষা চাষ করার সময় বিভিন্ন বিষয়, যেমন গৃহকর্তার অভিজ্ঞতা, খামারের আকার, বার্ষিক আয়, ফলন, প্রশিক্ষণ এবং চাষ সম্প্রসারণ সংক্রান্ত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই স্বল্পমেয়াদি জাতটি মাত্র ৮৫ দিনে ফলন দেয়।
সরিষার তেলের যত উপকার
প্রাচীনকাল থেকেই আমরা সরিষার তেল দিয়ে রান্না করেছি এবং শরীরে ও মাথার চুলে ব্যবহার করেছি। ঘানিতে ভাঙা সরিষার তেল শরীরের জন্য বেশ ভালো। যেসব মেশিন তেল উৎপাদনের সময় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম তাপমাত্রা উৎপাদন করে সেটিও শরীরের জন্য যুৎসই। বিআরবি হাসপাতালের একজন ডাক্তার একটি প্রবন্ধে বলেছেন, সরিষার তেল রান্নায় ব্যবহার করলে তা আমাদের অন্ত্রে পাচকরস উৎপাদনে সাহায্য করার মাধ্যমে হজম প্রক্রিয়া দ্রুত করে। এ ছাড়া একই প্রক্রিয়ায় ক্ষুধা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যদিও সরিষার তেলের ব্যবহার যথেষ্ট কম, তবে এই তেলের গুণাগুণ সম্পর্কে যারা অবগত আছেন, তারা নিয়মিতই এটি ব্যবহার করে চলেছেন। এই তেল ওমেগা আলফা ৩ ও ওমেগা আলফা ৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ উৎস হওয়ায় এটিকে স্বাস্থ্যকর তেল বলা হয়। গবেষক ইসরাত জাহান বলেছেন, বিভিন্ন ভোজ্যতেলের ওপর করা একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা যায়, সরিষার তেল ৭০ শতাংশ হৃৎপি-সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি কমায়। সরিষার তেল ব্যবহারে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস পায়, যা হৃদরোগের আশঙ্কা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ভোজ্যতেল ফসলের মধ্যে সরিষা অন্যতম। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হেক্টর জমিতে এর চাষাবাদ করা হচ্ছে এবং প্রায় আড়াই লাখ টন তেল উৎপাদন হচ্ছে। আর দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ২৪-২৫ লাখ টন। বিভিন্ন জাতের সরিষার বীজে প্রায় ৪০-৪৪ শতাংশ তেল থাকে। আর খৈলে থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ আমিষ। তাই খৈল গরু ও মহিষের জন্য খুব পুষ্টিকর খাদ্য।
বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও
কয়েক দিন আগে প্রায় দুই সপ্তাহের জন্য সয়াবিন তেল উধাও হয়ে গিয়েছিল। তেল আমদানিকারকরা নানা অজুহাতে লিটারে আট টাকা তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে সরকারকে বাধ্য করে, তার পরপরই সয়াবিন তেল বাজারে ছেড়েছেন। অনেকে মনে করছেন দেশে সরিষা উৎপাদন বৃদ্ধিকে ভালো চোখে দেখছেন না সয়াবিন তেল আমদানিকারকরা। তাই সুযোগ পেলেই নানা ছুতায় ভ্যাট-শুল্ক রদসহ অন্য সুবিধাদি আদায় করে নিচ্ছেন তারা। গত ৯ ডিসেম্বর সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হয়। এর ফলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকায়। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৪৯ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৭ টাকা। খোলা পাম তেলের লিটারও ১৪৯ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৭ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া বোতলজাত পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম এখন ৮৬০ টাকা, যা আগে ছিল ৮১৮ টাকা। বাজারে সরিষার তেলের নিয়মিত সরবরাহের কারণে সয়াবিন তেলের অভাবে আমাদের খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। সয়াবিন তেল যেসব দেশ রপ্তানি করে, তারাও নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘সরিষার তেল স্বাস্থ্যকর নয়’ এমন একটি কথা তারা গবেষণার বরাত দিয়ে আমাদের গেলানোর চেষ্টা করেছেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, যতদিন আমরা শুধু সরিষার তেল দিয়ে রান্না করে খেয়েছি ততদিন আমাদের গ্যাস্ট্রিকজনিত সমস্যা ছিল না বললেই চলে। সয়াবিন তেল চালু হওয়ার পরই আমাদের শরীরে অমøতাজনিত সমস্যা শুরু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে দিয়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে গেল। দাম সহনীয় রাখতে সরকার সয়াবিন তেলের আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ছাড়ের মেয়াদ তিন মাস বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সয়াবিনসহ বিভিন্ন তেলের ওপর ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্তটি আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আগে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
সরিষার উৎপাদন আরও বাড়ানো হচ্ছে
তেলবীজ উৎপাদন সংক্রান্ত যে প্রকল্পটি ২৫০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটি আরও ২২৭টি উপজেলায় শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির সংকটের কারণে শস্যবিন্যাসকে পরিবর্তন করে সরিষা চাষের জমি বের করা হয়েছে। আগে যে শস্যবিন্যাসটি প্রধান ছিল তা হলো ‘রোপা আমন-পতিত জমি-বোরো আবাদ’। অর্থাৎ বছরের দুটি আবাদের মাঝে একটি গ্যাপ থাকত। সরিষা এমন এক ধরনের শস্য, যা আবাদ করলে বোরো আবাদ বিঘিœত হয়, সেই সঙ্গে আমন আবাদেও সমস্যা হয়। এই বিন্যাসটি হাওর এলাকায় ‘পতিত জমি-বোরো আবাদ-পতিত জমি’ এমন দেখা যায়। প্রথম বিন্যাসটি পরিবর্তন করে ‘রোপা আমন-সরিষা-বোরো’ এমনটি করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে, রোপা আমন, সরিষা ও বোরোর ভ্যারাইটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে একই জমিতে তিনটি ফসল অনায়াসে করা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন কনসালট্যান্ট নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, পাহাড়ি এলাকাতেও এই প্রকল্পটি নেওয়া হবে। সেখানে পাহাড়ি ঢালে অল্প পানি দিয়েই সরিষা আবাদ হবে। আর উপত্যকার সমতলে কূপ খনন করা হবে, যাতে সরিষা ও অন্যান্য ফসলে সেচ দেওয়া য়ায় এবং পাহাড়ি জনগণের পানির চাহিদা মেটানো যায়। পানি ধরে রাখার জন্য পাহাড়ি ঝিরিগুলো খনন করে গভীর করা হবে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
govindashil@gmail.com