শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিভিন্ন প্রকল্পে বছর জুড়ে কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অডিটে ধরা পড়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি।
ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেসব প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে ওইসব প্রকল্পের শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে শোকজ করা হয়েছে। সতর্কও করা হয়েছে কয়েকজনকে। পাশাপাশি অনিয়ম রোধে ও ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে বেবিচক।
বেবিচক সূত্র জানায়, প্রতিটি বিভাগের ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র অডিট করা হচ্ছে। অডিটে কেনাকাটার কাগজপত্রে নানা ধরনের ভুল, অসংগতি ও কাগজপত্র মিসিং পাওয়া গেছে। এগুলো যেন না হয় সে জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। যারা ভুল করেছেন তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতি পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত নভেম্বর মাসে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়ার জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ২৮টি ইউনিটে বিভিন্ন ধরনের ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কর্তৃপক্ষের অডিট বিভাগ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্রয়কারী ইউনিট নিরীক্ষাকালে ক্রয়সংক্রান্ত বিধিবিধানগুলোর ব্যত্যয়সহ নানা অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতসহ বিধিবিধান যথাযথ অনুসরণ করার জন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাগুলো হচ্ছে রাজস্ব ব্যয় এবং মূলধন ব্যয়সহ সব খরচের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করা। ব্যয়বহুল বিশেষায়িত সরঞ্জামাদি ক্রয়ের আগে সেগুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবল রয়েছে কি না নিশ্চিত করা। নিত্যনৈমিত্তিক কাজে ব্যবহার্য যেমন ওয়াকিটকিসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তির প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।
পণ্য, কার্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর, ২০০৮ এর তফসিল-১ বর্ণিত প্রযোজ্য আদর্শ দলিলগুলো ব্যবহার করতে হবে। পণ্য, কার্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কার্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দরপত্র দলিলের যথাযথভাবে নির্ধারণ করা এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার জিআই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে কার্য সম্পাদনকারীকে বিল পরিশোধ করতেই হবে। বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে চুক্তিপত্রের শর্তাবলি যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে বলা হয় নির্দেশনায়। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পরিশোধ ভাউচারে যথাযথ রেফারেন্সসহ প্রতিটি ক্রয়সংক্রান্ত আলাদা পূর্ণাঙ্গ নথি সংরক্ষণ করতে হবে। সব ধরনের আয়, ব্যয়, সম্পদ এবং দায়ের যথাযথ হিসাবভুক্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ক্রয়কৃত পণ্যসামগ্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাণ ও গুণগতমান যাচাইসহ বিস্তারিত উল্লেখপূর্বক একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রত্যয়ন সংরক্ষণ করতেই হবে। নির্ধারিত স্থানে গুণগতমানের প্রত্যয়নকারীর স্বাক্ষর নিশ্চিতসহ যথাযথভাবে মেটেরিয়াল রিসিভিং রিপোর্ট (এমআরআর) প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক।
এছাড়া সরঞ্জামাদি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে পুরনোগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার প্রমাণক সংরক্ষণ করা এবং যথাযথভাবে ডেড স্টক রেজিস্টার সংরক্ষণ করতেই হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া বলেন, কেনাকাটার কাগজপত্র অডিট বিভাগ নিরীক্ষা করছে। দুর্নীতি বা অনিয়ম কিছু হয়েছে কি না তা দেখা হচ্ছে, এ রকম কিছু হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। থার্ড টার্মিনালে কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর সঙ্গে বিদেশি কোম্পানি জড়িত, বড় ধরনের দুর্নীতি এখনো পাওয়া যায়নি। প্রয়াত উপদেষ্টা থার্ড টার্মিনালের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। আমরা প্রতিটা জিনিস দেখছি। কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বছরখানেক আগে বেবিচকের ৭টি প্রকল্প কাজের যাবতীয় নথিপত্র তলব করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সাত ধরনের প্রকল্প কাজসহ ৯ ধরনের নথিপত্র তলব করা হয়। তখন সংস্থাটির প্রকৌশলী বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এর আগে ২০১৯ সালের জুন মাসে শাহজালাল, শাহ আমানত, সিলেট ওসমানী ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৫ প্রকল্পের ফাইল তলব করা হয়েছিল। তৎকালীন অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক জাহিদ কামাল নথিপত্র তলব করেছিলেন। ওই সময় প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ৯ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিও তলব করা হয়েছিল। কিন্তু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তারা। আবারও বিষয়টি সচল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।