অনিশ্চয়তায় পড়েছে বহির্বিশ্বে নাবিকদের বাজার। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাবিকরা পালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে বাংলাদেশি নাবিকদের চাকরি দিতে রাজি হচ্ছে না বিদেশি কোম্পানিগুলো। একইভাবে বাংলাদেশি পতাকাবাহী কোনো জাহাজ ইউরোপ-আমেরিকাসহ অনেক দেশে পৌঁছার পর নাবিকদের তীরে নামার ভিসা দেওয়া হয় না। উপরন্তু কোনো নাবিক যাতে পালাতে না পারে সেজন্য প্রতি জাহাজে চারজন করে বডিগার্ড নিয়োগ দিতে হয়। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয় বলে জাহাজ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি নাবিক নিয়োগ দিতে আগ্রহ দেখায় না। এতে কমে আসছে নাবিকদের চাকরির বাজার।
বহির্বিশ্বে চাকরির বাজার কমে এলেও বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার নাবিক (ক্যাডেট ও রেটিংস) বের হয়ে আসছে। কিন্তু এদের চাকরি হচ্ছে না বিদেশি কোম্পানিগুলোয়। আর দেশীয় জাহাজ কোম্পানিগুলো এত বেশি নাবিক নিয়োগ দেওয়ার সক্ষমতাও নেই। ২০১০ সালে এমভি জাহান মনি যখন সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়েছিল সেই জাহাজে শিক্ষানবিশ ক্যাডেট ছিলেন শরিফুল ইসলাম। ১৪ বছরের ব্যবধানে সেই শরিফুল ইসলাম এখন অন্য বাণিজ্যিক জাহাজে চিফ অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন। গতকাল শনিবার তিনি দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করে চায়না আসার পথে কথা হয় দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিচিত অনেক নাবিক চাকরির জন্য আমাদের কাছে ফোন করেন। তারা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়ার এক বছর পরেও জাহাজে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। দুই লাখ শ্রমিক বহির্বিশ্বে চাকরি করে যে রেমিট্যান্স আয় করতে পারেন, সে তুলনায় ২০০ নাবিক সমপরিমাণ অর্থ আয় করতে পারেন। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই খাতে কর্মসংস্থান তৈরিতে আমাদের সরকারের তেমন একটা উদ্যোগ নেই।’
বাংলাদেশি মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত খুঁজে বের করতে হবে নাবিকরা পালায় কেন? আর তাদের যারা নিয়োগ দিয়েছে সেই কোম্পানিগুলো সরকারের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গঠিত হয়েছে কি না। ভুঁইফোঁড় কোম্পানিগুলো নাবিক নিয়োগ দিয়ে জাহাজে তুলে দেয় এবং তারা পালিয়ে গিয়ে দেশকে বিপদে ফেলছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও যারা নাবিকের গ্যারান্টার হয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
নাবিকরা পালায় কেন : বিভিন্ন জাহাজের ক্যাপ্টেন ও চিফ অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাজে চাকরি করে তিন মাসের ভয়েস করে দুই মাস পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানো যায়। সবচেয়ে আরামের এবং নিশ্চিত আর্থিক স্বচ্ছলতার চাকরি নাবিক পেশা। কিন্তু তারপরও কিছু নাবিক জাহাজ থেকে পালিয়ে আমেরিকা, ইউরোপে চলে যায়। যারা যায় তারা পাঁচ-ছয় বছরেও দেশে আসার সুযোগ পায় না। আর নিজের জীবনের অনিশ্চয়তাও রয়েছে।
চিফ অফিসার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মানসিকতার কারণে তারা জাহাজ থেকে পালিয়ে যান। আমাকে আমেরিকা, ইউরোপ যেতে হবে। আর নাবিক জীবনের যখনই জাহাজ আমেরিকা বা ইউরোপের বন্দরে পৌঁছাবে তারা পালিয়ে যান। তারা পালিয়ে গিয়ে আমাদের নাবিক সেক্টরকে ধংস করে দিয়ে যান।’
এদিকে নৌ-অধিদপ্তর থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৯ নাবিকের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে তিনটি জাহাজ বাংলাদেশের মেঘনা কোম্পানির। বাকি জাহাজগুলো বিদেশি কোম্পানির নাবিক। মেঘনা কোম্পানির জাহাজ থেকে নাবিক পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা হয় সংস্থাটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি ক্যাপ্টেন আমান উল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কেন যে জাহাজ থেকে পালিয়েছেন তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না। যদি নতুন কোনো ক্যাডেট পালাত বুঝতে পারতাম আমেরিকায় যাওয়ার নেশা থেকে পালিয়েছেন। কিন্তু যারা পালিয়েছেন তারা এই সেক্টরে অনেক পুরনো ও অভিজ্ঞ নাবিক। এমনকি হেড কুকও ছিল পালানোর তালিকায়।’ ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর মেঘনা অ্যাডভেঞ্চার রাশিয়া থেকে পণ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিন্স বন্দরে যাওয়ার পথে মিসিসিপি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চার নাবিক পালিয়ে গিয়েছিলেন।
এই ১৯ জন নাবিক কখন পালিয়েছেন জানতে চাইলে নৌ-অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মাকসুদ আলম বলেন, গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সময়ে এসব নাবিক বাংলাদেশি ও বিদেশি কোম্পানির জাহাজ থেকে পালিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে আমরা এরও আগের পালিয়ে যাওয়া নাবিকদের তালিকা প্রকাশ করব। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে, যাতে আগামীতে আর কেউ পালানোর চিন্তা না করে।
কী ক্ষতি হচ্ছে আমাদের : ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘নাবিকরা পালিয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক বন্দরে আমাদের নাবিকদের শোর পারমিশন (তীরে নামার অনুমোদন) নেই। আবার অনেক বন্দরে আমেরিকা, ইউরোপ, দুবাইসহ অনেক দেশের বন্দরে নামারও অনুমোদন নেই। এতে ভয়েজের মাঝপথে কোনো নাবিক জরুরি প্রয়োজনে চাইলেও নেমে আসতে পারেন না। সর্বোপরি বহির্বিশ্বে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।’
একই মন্তব্য করেন নৌ-অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মাকসুদ আলম। তিনি বলেন, নাবিকদের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে এবার আমরা খুবই কঠোর অবস্থানে। ইতিমধ্যে ১৯ জন নাবিকের বিরুদ্ধে নৌ-আদালতে মামলা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পালিয়ে যাওয়া সব নাবিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের যারা গ্যারান্টার (কোনো নাবিক জাহাজে ওঠার আগে একজন ব্যক্তিকে জিম্মাদার হতে হয়) হয়েছিল তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। ১৯ ডিসেম্বর নৌ-অধিদপ্তর বিজ্ঞপ্তিতে নাবিকদের পালিয়ে যাওয়ার কথা জানায়।
মেঘনা গ্রুপের ক্যাপ্টেন আমান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এখন আমাদের কোনো জাহাজ আমেরিকা বন্দরে গেলে চারজন বডিগার্ড নিয়োগ দিতে হয়। প্রতি বডিগার্ডের বেতন দিনে প্রায় ৭৫০ মার্কিন ডলার করে। একটি জাহাজ যদি ২০ দিন একটি বন্দরে অবস্থান করে তাহলে বডিগার্ড বাবদ প্রায় ৩৬ হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। আর এর সঙ্গে বিড়ম্বনা তো আছেই।’
পালিয়ে যাওয়া ১৯ নাবিক : ১৯ নাবিকদের বেশিরভাগ চট্টগ্রাম, ফেনী ও নোয়াখালীর বাসিন্দা। নাবিকরা হলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি থানার দেবালেরকান্দা গ্রামের সোহানুর রহমান (সিডিসি নম্বর সি/ও/১১৬১৭), নাটোরের বাগাতিপাড়ার চকতকিনগর গ্রামের মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম (সি/ও/৩০৭৩০), ফেনীর দাগনভূঞার দক্ষিণ আলীপুর গ্রামের আবু সুফিয়ান (টি/৩০০৫৮), চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার দক্ষিণ হালিশহর গ্রামের মোস্তফা কামাল (টি/৩২৮৪৪), নোয়াখালী কোম্পানিগঞ্জের মুছাপুর গ্রামের ইসকান্দর মিজি (টি/৩৪০৬৫), চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের গাছুয়া গ্রামের মো. সানাউল্লাহ (টি/২৯৬৩৮), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘাটলা গ্রামের মোহাম্মদ আনোয়ারুজ্জামান (টি/২৯৫০৪), দিনাজপুরের বিরল থানার মির্জাপুর গ্রামের আব্দুল কুদুস (টি/৩০৯৫২), আমিনুল ইসলাম (টি/৩২২২৮), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের উলুচাপুর গ্রামের ওপি হোসেন (টি/৩৪১৩১), মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার মধ্য বাউশিয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম (টি/২৯৭৩৮), চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানার মগধরা গ্রামের মিজানুর রহমান (টি/২৯৭৮৭), নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের পূর্ব চর হাজারী গ্রামের মোহাম্মদ শেখ আলম (টি/৩৪৩০৬), নোয়াখালীর সোনাইমুরি উপজেলার আমকি গ্রামের মেহেদী হাসান (টি/৩৪৩৩২), জামালপুর সদরের লক্ষ্মীরচর গ্রামের আল আমিন (সিডিসি নম্বর টি/৩৪৩৩৫), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মির্জানগর গ্রামের মো. ইমাম হোসেন (সিডিসি নম্বর টি/৩১৬৪১), নেত্রকোনার খালিয়াজুরি থানার শালদিগা গ্রামের এনামুল হক (সিডিসি নম্বর টি/৩১৩৯৩), চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের বাসারাত নগর গ্রামের ইমরুল হোসেন (টি/৩৪৭৭৯) এবং চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানার পশ্চিম অলিনগর গ্রামের মোহাম্মদ ইব্রাহিম (টি/৩১২৮৬)। এসব নাবিক সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে তা নিকটস্থ থানা অথবা নৌ-অধিদপ্তরে জানানোর জন্য বলা হয়েছে।
দেশে নাবিকের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৬ হাজার ৪৮১ জন নাবিক সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি করতেন ২০২৩ সালের শেষে এসে এ সংখ্যা ৯ হাজার ৮৭৩-এ পৌঁছেছে। তবে চাকরির হিসেবের চেয়ে সনদধারী নাবিকের সংখ্যা অনেক বেশি। বর্তমানে সনদধারী নাবিকের সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৯১ জন।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে ৪ গাড়ির সংঘর্ষ
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে কয়েকটি যানবাহনের সংঘর্ষ, হতাহতের আশঙ্কা
আজ পঞ্চগড়ে বিএনপির সমাবেশ