ইলন মাস্কই আসল প্রেসিডেন্ট!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কে? নিঃসন্দেহে এখন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আর ২০ জানুয়ারির পর প্রেসিডেন্ট হবেন নভেম্বরের ভোটে জয় পাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বেশ কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য বলছেন, আসল প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ইলন মাস্ক। ডেমোক্র্যাটরা তো বটেই, অনেক রিপাবলিকান পর্যন্ত মাস্ককে বলছেন প্রেসিডেন্ট। আর ট্রাম্পকে বলছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট! বিশেষ করে সরকারি অর্থায়ন বিল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সদ্যই তৈরি হওয়া অচলাবস্থার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রেন্ড হয়েছে প্রেসিডেন্ট মাস্ক শব্দটি।

রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বিলটি গত বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পাস হতে পারেনি। সে কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, অর্থাৎ, শাটডাউনের শঙ্কা দেখা দেয়। দেশকে এই হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল ইলন মাস্কের।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত জাতীয় সরকারের খরচ চালানোর জন্য রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের সম্মতিতে আনা ওই অন্তর্বর্তী বিলে বাগড়া দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। বিলটিতে খুবই ব্যয়বহুল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, বলে স্যোশাল মিডিয়া এক্সে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

বিলটি যাতে পাস না হয়, সেজন্য তিনি কংগ্রেস সদস্যদের হুমকিও দিয়েছিলেন। হাউজ ও সিনেটের যে সদস্যরা বিলের পক্ষে ভোট দেবেন, তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে মাস্ক হুমকি দেন। ট্রাম্প প্রথমে বিলটিতে রাজি থাকলেও, মাস্কের ঘোর আপত্তির পর তার সুরেই কথা বলেন ট্রাম্পও। সরকারি বিষয়ে ইলন মাস্কের এমন প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ আর ট্রাম্পের তাকে অনুসরণ, রাজনীতিতে বিশ্বের শীর্ষ এই ধনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে আসাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। মাস্ককেই বেশি ক্ষমতাশালী ভাবতে শুরু করেছেন অনেকে। তাই ট্রাম্পের বদলে এখন মাস্ককেই প্রেসিডেন্ট বলে বিদ্রুপ করছেন কংগ্রেস সদস্যরা। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটরা মাস্ককে নিয়ে ব্যঙ্গ করে নানা মন্তব্যও করছেন।

দেশটির হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসের সদস্য জিম ম্যাকগভার্ন কৌতুক করে বলেছেন, ‘অন্তত আমরা জানি যে, কে দায়িত্বে আছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট। আর ট্রাম্প এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট।’

একইভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গারসিয়া এক্সে শেয়ার করা এক পোস্টে বলেন, ইলন মাস্কের প্রেসিডেন্সিকে স্বাগতম।

হাউজ ডেমোক্র্যাটিক হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক হতাশা প্রকাশ করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এবার আবারও আমরা বিশৃঙ্খলায় আছি...কিন্তু কেন? কারণ ইলন মাস্ক, একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি বললেন, আমরা এই চুক্তি করব না, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অনুসরণ করলেন।

ডেমোক্র্যাটদের এসব মন্তব্য থেকে এটাই স্পষ্ট যে তারা মনে করছেন, ইলন মাস্কের প্রভাব প্রচলিত ক্ষমতার ভারসাম্য ক্ষুণœ করছে। মাস্কের প্রভাব শুধু কথায় নয়, কাজেও আছে। রিপাবলিকান নীতিতে, বিশেষ করে ব্যয় কাটছাঁট এবং বাজেট নিয়ে তার সরাসরি প্রভাব অনেককেই অস্বস্তিতে ফেলেছে।

টেসলা, স্পেসএক্স এবং এক্সের সিইও ও উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক একুশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের নির্বাচনে মাস্ক খোলাখুলিভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন এবং তার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। ট্রাম্পকে ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার অনুদানও দেন মাস্ক। ট্রাম্পও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর তার নতুন প্রশাসনে মাস্ককে জায়গা দিতে দেরি করেননি। ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ নামে নতুন একটি বিভাগ বানিয়ে মাস্ককে এর প্রধান পদে বসিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।

ওই পদের জন্য মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীকে নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এই দুই বিস্ময়কর আমেরিকান একসঙ্গে আমার প্রশাসনের জন্য সরকারি আমলাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলা, অতিরিক্ত বিধিবিধান কমানো, অযথা ব্যয় কমানো এবং ফেডারেল সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন করার পথ প্রশস্ত করবে, যা আমেরিকা বাঁচাও আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য।

ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বিভাগ ঠিক কী কী কাজ করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু, এটিকে সরকারের গতানুগতিক কাঠামোর বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

 ট্রাম্পের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের বাইরে থেকে পরামর্শ এবং নির্দেশনা দেবে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি। তিনি বলেন, এর লক্ষ্য, সরকারের মধ্যে ‘উদ্যোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে আসা। এটা হবে আমাদের সময়ের ‘দ্য মানহাটন প্রজেক্ট’। ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে আমেরিকার প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল। নতুন দপ্তরের প্রসঙ্গে সেই ঘটনার উল্লেখ করেছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই নাগাদ এ দপ্তরের কাজ সমাপ্ত করার সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন তিনি। এ বিভাগের বিষয়ে ইলন মাস্ক বলেছেন, এটা সিস্টেমের মধ্যে একটা শকওয়েভ হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেই সঙ্গে সরকারি অপচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কারও জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তাকে দেওয়া পদে মাস্কের মনযোগ থাকবে সরকারের কার্যকারিতার দিকে। এর মানে, ফেডারেল কর্মীদের নিয়োগ ও ছাঁটাই নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার এমনকি বিভিন্ন সংস্থার কাঠামোকে খোলনলচে বদলে ফেলার ক্ষমতা পাবেন। তবে, মাস্কের যে এর চেয়েও বড় প্রভাব থাকবে, তা প্রায় নিশ্চিত। অভিবাসন ও ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার, এমন অনেক বিষয়ে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একমত। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন ও লোকজনকে ইভি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার মতো কয়েকটি বিষয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করলেও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মাস্ক এখন ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এমন রাজনৈতিক বন্ধুত্ব তৈরির সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন, যা এর আগে আমেরিকা কখনো দেখেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে অনেক কিছুই পাওয়ার আছে মাস্কের। তার বিভিন্ন ব্যবসা এরই মধ্যে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে গত বছর বিভিন্ন সংস্থা থেকে চুক্তিবাবদ ৩০০ কোটি ডলারের আর্থিক অনুদান পেয়েছেন তিনি। তার রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স প্রায়শই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারী পাঠায় ও মহাকাশে সামরিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে থাকে। এমনকি নির্বাচনের আগেও মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ট্রাম্পকে স্পেসএক্স কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন মাস্ক, যা হয়তো তাদের সম্পর্ক আরও টেকসই করতে সাহায্য করবে।

টাইমস এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মাস্ক শুধু একজন উদ্যোক্তা নন। তিনি এখন নতুন ‘মিডিয়া সম্রাট’, যার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া, এ খাতের কয়েকটি নিয়ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও পাচ্ছেন তিনি।

মাস্ক নিজেকে বাকস্বাধীনতার ধারক হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু টুইটার কেনার পর এর নাম বদলে এক্স রাখার পাশাপাশি নিষিদ্ধঘোষিত শত শত ব্যবহারকারীকে তিনি প্ল্যাটফর্মটিতে ফিরিয়ে এনেছেন, যাদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানো অথবা সহিংসতায় উসকাানি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে ছিলেন খোদ ট্রাম্পও। এতে করে মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন আন্দোলনের নতুন আতুরঘর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে এক্স।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কারণেই আগামী চার বছর হয়তো ট্রাম্প রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন আর ট্রাম্পকে চালাবেন মাস্ক।