গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী রসনাবিলাসী কুমড়া বড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন সিরাজগঞ্জ জেলার ৯ উপজেলার কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগররা। শীত মৌসুম এলেই এই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর কুমড়া বড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়। এরার শীতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কুমড়া বড়ি তৈরি ও বিক্রি করে এ অঞ্চলের শত শত নারী-পুরুষ সচ্ছল জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ অঞ্চলের সুস্বাদু কুমড়া বড়ি অত্যন্ত মানসম্মত হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। জেলার উপজেলাগুলো হলো সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, কামারখন্দ, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও উল্লাপাড়া।
উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক পরিবার এই কুমড়া বড়ি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এ এলাকার তৈরি কুমড়া বড়ি এলাকার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে এ এলাকার তৈরি কুমড়া বড়ি বিক্রি হয়।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, ১০ থেকে ১২ জন করে নারী একত্রে কাজ করে কুমড়া বড়ি তৈরি করছেন। এর মধ্যে ৫ জন কুমড়া বড়ি তৈরির উপাদান একত্রে মাখানোর কাজ করেন। আবার ৪-৫ জন কাপড়ের মধ্যে তুলে বিশেষ কায়দায় বড়ি তৈরি করেন। বাকি কয়েকজন বড়ি রোদে শুকানোর কাজ করছেন। রাস্তার দুই পাশে কুমড়া বড়ি তৈরি ও শুকানোর দৃশ্য চোখে পড়বে। বড়ি শুকানো হলে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হয়।
তাড়াশের নওগাঁ গ্রামের কুমড়া বড়ি তৈরির কারিগর আল্পনা খাতুন বলেন, আগের রাতে মাষকলাইয়ের ডাল ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর সেই ডালগুলো পাটায় পিষে পেস্ট তৈরি করা হয়। এরপর চালকুমড়ার কুচি, পরিমাণ মতো পাঁচফোড়ন গুঁড়া ও সামান্য কালোজিরা দিয়ে উপকরণগুলো একসঙ্গে মিশ্রণ করে অনেকক্ষণ ধরে মাখাতে হয়। তারপর ছাদ ও পরিষ্কার স্থানে চাটাই, টিন বা কাপড় বিছিয়ে ছোট ছোট করে বড়ি তৈরি করা হয়। এই বড়ি ৩ থেকে ৪ দিন ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে বিক্রির উপযোগী করে তৈরি করা হয়।
উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া গ্রামের নারী কারিগর শিল্পী রানী বলেন, শীতের শুরু থেকে আমরা বড়ি তৈরি করি। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বড়ি তৈরির কাজ করি। আকাশে রোদ ভালো থাকলে তিন-চার দিন সময় লাগে বড়ি শুকাতে। আকাশ মেঘলা অথবা রোদ কম হলে বড়ি তৈরিতে সমস্যা হয়। কম রোদে শুকানো বড়ির দাম কম হয় বাজারে। বছরে চার মাস বড়ি তৈরি করে সংসারের জন্য বাড়তি আয় করি আমরা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার হরিপুর গ্রামের নিয়তিবালা নামে এক কারিগর বলেন, এক কেজি মাষকলাই থেকে ৬০০ গ্রাম বড়ি তৈরি হয়। কালাই ভাঙানো, মসলা খরচসহ ৬০০ গ্রাম বড়ি তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১৫৫ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি বড়ি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কেজি বড়িতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা করে লাভ হয়। যা উপার্জন করি তা দিয়ে সংসারে খরচ করে একটু সচ্ছল জীবনযাপন করি। এতে দিনমজুর স্বামীকে আর্থিকভাবে উপকার করা হয়।
কুমড়া বড়ি ব্যবসায়ী আল-আমিন বলেন, প্রতিদিন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কাজ করে এসব নারী শ্রমিকরা। এতে প্রতিদিন মজুরি পান ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে। তিনি আরও বলেন, পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে আমরা কুমড়া বড়ি তৈরি করে আসছি। সরকারি সহায়তা পেলে বড় পরিসরে কুমড়া বড়ি তৈরি করে বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবো।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুইচিং মং মারমা বলেন, কুমড়া বড়ি তৈরির মাধ্যমে এ এলাকার অনেক মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। তাদের প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়ে ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা হবে।
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক জাফর বায়েজীদ বলেন, নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি কুমড়া বড়ি তৈরি করে সচ্ছল জীবনযাপন করছে। তাদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদে ঋণসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।