রাশিয়ার হাইব্রিড যুদ্ধের ভয়ে জার্মানি

ইউরোপে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধটা দৃশ্যত রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে হলেও গত প্রায় তিন বছর ধরেই এর প্রভাব পড়েছে ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে অঞ্চলটির বড় অর্থনীতির দেশগুলো যারা ন্যাটোর সদস্য তাদেরই চলমান এ যুদ্ধের মাশুল গুনতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ন্যাটো সরাসরি এ সংঘাতে না জড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে এর ইউরোপীয় সদস্যদের অনেকটা বাধ্য হয়েই দাঁড়াতে হয়েছে ইউক্রেনের পাশে। রাশিয়ার ওপর আরোপ করতে হয়েছে নানা নিষেধাজ্ঞা। ফলত তাদের রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরাগভাজন হতে হয়েছে তাদের। এখনো দেশগুলো রাশিয়ার নানা পদক্ষেপের ভয়ে আছে। যেমন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানিই আছে আতঙ্কে।

সম্প্রতি জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোরিস পিস্টোরিওসের কণ্ঠেও উঠে আসে সে আতঙ্কের প্রতিধ্বনি। গত রবিবার তিনি বলেছেন, তাদের দেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে হাইব্রিড আক্রমণ করতে পারে রাশিয়া! অবশ্য রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড আক্রমণের জবাব দিতে বার্লিন অবশ্যই প্রস্তুত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

হাব্রিড হামলা হলো একধরনের সাইবার আক্রমণ। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এই হামলার মাধ্যমে একটি দেশের আইটি, নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ডিভাইসে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।

জার্মানির সংবাদমাধ্যম ফুংকে মেডিয়েন গ্রুপকে জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘হাইব্রিড হামলার দিকে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। আর এর লক্ষ্য হলো জার্মানি। কারণ পুতিন ভালো করেই জানেন, কীভাবে আমাদের খোঁচা দিতে হয়।

এ সময় তিনি জার্মানির অবকাঠামো এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে নর্থ সি এবং বাল্টিক সির ঘটনা যার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হয়। তার মতে, জার্মান সমাজকে বিভক্ত করতে ক্রেমলিনপন্থি গোষ্ঠীগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে ডানপন্থি এবং জনপ্রিয়তা পাওয়া দলগুলো লাভবান হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ক্যাম্পেইন চলছে, নির্বাচনী প্রচারণায় হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন মতবাদকে যেমন এএফডি ও বিএসডাব্লিওকে অর্থায়ন করা হচ্ছে, যারা বলছে যে, আমরা নিজেদের সুরক্ষার বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, পুতিনের এই কৌশল ঠেকাতে সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছুই করতে হবে, বলেন তিনি।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বলছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এর আগেও একই আশঙ্কার কথা  বলেছিলেন। চলতি বছরই আরেক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, মস্কোর পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে কোনো হুমকি না থাকলেও ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হতে পারে তারা।

চলতি বছরের মার্চে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজারও রাশিয়ার হাইব্রিড যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, জার্মানির জনমতকে প্রভাবিত করতে নতুন করে প্রচেষ্টায় রত মস্কো। মধ্য-বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সদস্য ন্যান্সি ফেজার জুডডয়চে সাইটুং পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সব বিপদ একটি নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে।

তিনি সে সময় তার দেশের জনগণকে বলেছিলেন, ভোটের আগে রাশিয়া ক্রেমলিনপন্থি দলগুলোর সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।

হাইব্রিড যুদ্ধ কী?

হাইব্রিড যুদ্ধ শব্দবন্ধটি একটি জটিল কৌশল বোঝায়। সামরিক কৌশলের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং প্রোপাগান্ডাও রয়েছে এর মধ্যে। এটি অবশ্য নতুন কোনো কৌশল নয়। বহু শতাব্দী ধরে বিদেশে জনমত প্রভাবিত করতে এই ধরনের নানা উপায় ব্যবহার করে আসছে বিভিন্ন দেশ। কিন্তু গত দুই দশক ধরে, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের উত্থানের ফলে এই হাইব্রিড যুদ্ধ এখন অনলাইনেও জায়গা করে নিয়েছে।

এই যুদ্ধ কীভাবে কাজ করে?

হাইব্রিড যুদ্ধকে অনেকে ‘ছায়া যুদ্ধ’ এর একটি রূপ হিসাবে বর্ণনা করেন। এই যুদ্ধ জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে ঘটে এবং কখনই এই যুদ্ধের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় না।

হামবুর্গ-ভিত্তিক ক্যোরবার ফাউন্ডেশনের রাশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লেসলি শ্যুবেল ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘হাইব্রিড যুদ্ধের ধারণাটি হচ্ছে, এটি যে ঘটছে তা আপনি খেয়ালই করবেন না।’

গত জানুয়ারিতে জার্মান সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি সমন্বিত রাশিয়ান প্রোপাগান্ডামূলক কর্মকাণ্ড উন্মোচন করার কথা জানিয়েছিল। এই প্রোপাগান্ডা বন্ধ করার আগেই বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ১০ লাখেরও বেশি বার্তা ছড়ানো হয়েছে। এই সব বার্তায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউক্রেনকে দেওয়া সাহায্য স্থানীয় নাগরিকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, এমন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে জার্মান সমাজে বিভাজন ও ক্ষোভ সৃষ্টি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করা।

শ্যুবেল বলেন, সন্দেহ তৈরি করতে এরই মধ্যে সফল হয়েছে রাশিয়া।’

হাইব্রিড যুদ্ধের বেশিরভাগই অপ্রকাশ্যে থাকলেও কিছু অপারেশন ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রকাশ করা হয়। মার্চের শুরুতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আরটি জার্মান সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গোপন

কথোপকথন প্রকাশ করে। ‘টরাস লিক’ নামে পরিচিত এই কথোপকথন জার্মান সামরিক বাহিনীকে বেশ বিব্রত করে এবং এ নিয়ে একটি কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি হয়।

বার্লিন-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেনট্রুম লিবেরালে মডার্নের রাশিয়া প্রোগ্রামের প্রধান মারিয়া সানিকোভা-ফ্রাংক বলেন, ‘এই ঘটনাটিকে পুতিন নিজের দেশেও কাজে লাগিয়েছেন।

ফাঁস হওয়া কথোপকথনে জার্মান সামরিক কর্মকর্তাদের ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক করতে শোনা গেছে। রুশ মিডিয়া এরপর দাবি করেছে যে জার্মানির সেনাবাহিনী রাশিয়ান অঞ্চলে আক্রমণ করার জন্য পরিকল্পনা করছে।

সানিকোভা-ফ্রাংক ডয়েচে ভেলেকে বলেন, পুতিন যে ভাবমূর্তি তৈরি করতে চান তা হলো, জার্মানি এবং পশ্চিমারা রাশিয়াকে হুমকি দিচ্ছে। তিনি খুব এই প্রচার করতে সফল হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি আলেক্সি নাভালনির মৃত্যু এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকেও সফলভাবে সবার মনোযোগ সরাতে পেরেছেন।’

কীভাবে এই যুদ্ধ মোকাবিলা করা যায়?

হাইব্রিড যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দেশগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, ভোট প্রযুক্তি সাইবার আক্রমণ থেকে পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত। ‘টরাস কথোপকথন’ ফাঁস থেকে বোঝা গেছে যে সমাজের সব ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি কতটা প্রয়োজনীয়।

নাগরিকদের বিভ্রান্তিমূলক কৌশল সম্পর্কে সচেতন করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য প্রতারণা এবং প্ররোচিত করার জন্য কীভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটিও সবাইকে জানানো জরুরি বলে মনে করেন তারা।

সানিকোভা-ফ্রাংক মনে করেন, এই প্রচারের প্রক্রিয়াগুলো প্রকাশ করাটা গুরুত্বপূর্ণ এটি কীভাবে কাজ করে, কীভাবে এটি আমাদের প্রভাবিত করে, কীভাবে এটি আমাদের মতামতকে প্রভাবিত করে।