স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ‘অস্বাভাবিক’ বদলি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গত মাসে চিকিৎসকদের অস্বাভাবিক বদলির ঘটনা ঘটেছে। ২৩ অক্টোবর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ মাস ১০ দিনে ২ হাজারের বেশি চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। বদলির এ ঘটনা অধিদপ্তরের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে পাঁচ গুণ। মেডিকেল অফিসার থেকে শুরু করে পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা বদলির তালিকায় রয়েছেন।

অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর ও নতুন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবিএম আবু হানিফের যোগ দেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার মাসখানেক পর বদলি শুরু হয়। তাতে অস্বাভাবিক গতি যুক্ত হয় এ দুই কর্মকর্তার যোগ দেওয়ার পর; মহাপরিচালক মধ্য অক্টোবরে ও পরিচালক আগস্টের শেষে।

আগে যেখানে মাসে সর্বোচ্চ ১০০ বদলি হতো, সেখানে এই এক মাসেই বদলি হয়েছেন ২ হাজারের বেশি চিকিৎসক। ১৩ নভেম্বর এক দিনেই ৩১টি আদেশের মাধ্যমে ৩০৬ জনের ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩০টি আদেশের মাধ্যমে ২৬৭ জনের বদলি হয়েছে।

অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তারা এটাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন। নাম প্রকাশ না করে তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগে যেখানে মাসে সর্বোচ্চ ১০০টি বদলির আদেশ করাতে তাদের ঘাম ছুটে যেত, এখন দিনেই বদলি হচ্ছে ৩০০-এর বেশি।

অধিদপ্তর যদিও বলছে, বিগত সময়ের বদলিজট কাটাতেই এসব বদলি। অস্বাভাবিক বদলির পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে বলে জানা গেছে। এক. আগের সরকারের দলীয় বা সমর্থক চিকিৎসকদের শাস্তিমূলক বদলি। দুই. বিগত সরকারের রোষানলের শিকার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে আসা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতাদের আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগ দেওয়া বা সুবিধাভোগী তৈরি করার জন্য বদলি। তিন. রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চিকিৎসকদের নিয়োগবাণিজ্য।

বদলি বাণিজ্যকেই মূল কারণ মনে করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মোট বদলির মাত্র এক ভাগ হচ্ছে ড্যাব ও এনডিএফের বৈষম্যের শিকার চিকিৎসকদের শাস্তিমূলক বদলির অবসান। বাকি তিনভাগই বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। প্রতি বদলিতে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য জানা গেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, গড়ে ২ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ১ হাজার ৫০০ বদলিতে বাণিজ্য হয়েছে ৩০ কোটি টাকার। অস্বাভাবিক বদলিতে টিএ-ডিএ বিল হিসেবে সরকারের ইতিমধ্যে গচ্চা গেছে ৪ কোটি টাকা।

সাধারণ চিকিৎসকদের অনেকেই অন্যায় বদলির শিকার হচ্ছেন। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, যার কোনা কর্মস্থলে মাত্র চার মাস চাকরি হয়েছে, তাকেও বদলি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ হতে যার দুই মাস ট্রেনিং বাকি ছিল, তাকেও বদলি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বদলিজট লেগে ছিল। এখন গত সরকারের সময়ে বঞ্চিতদের আনা হচ্ছে ও স্বৈরাচারের অনুসারীদের সরানো হচ্ছে। নীতির বাইরে কিছু হচ্ছে না।’

এসব বদলিতে টাকা নেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ তিনিও পেয়েছেন বলে জানান মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘বদলিতে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত পর্যায়ে এলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’ 

এসব বদলির সঙ্গে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) তেমন সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ড্যাবের সদস্য তিন হাজারের মতো। এর মধ্যে সরকারি চাকরি করে এক হাজারেরও কম। যে পরিমাণ বদলির কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানে ড্যাবের সংখ্যা খুবই কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডিজির পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু যারা পোস্টিং বদলি করেন, তারা আগের লোকজনই। বদলির ব্যাপারটার সঙ্গে ড্যাবের সম্পৃক্ততা ওইভাবে নেই।’

তিনি বলেন, এসব বদলিতে টাকাপয়সা লেনদেনের অভিযোগও উঠছে। তা অস্বীকার করব না। পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইলে আপাদমস্তক বদলাতে হবে। বদলির নীতিমালা করতে হবে।’

বদলিতে ড্যাব এনডিএফের সর্বোচ্চ ৫০০

দুই হাজার বদলির মধ্যে ড্যাব ও এনডিএফ-সমর্থিত সর্বোচ্চ ৫০০ চিকিৎসক-কর্মকর্তা থাকতে পারেন বলে মনে করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ৪০০ ড্যাব ও ১০০ এনডিএফ-সমর্থিত চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ১ হাজার ৫০০ বদলির মধ্যে ৬০০-এর মতো আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসকদের শাস্তিমূলক বদলি। ড্যাব বা এনডিএফের সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরির জন্য বা ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে আসার জন্য এ বদলি করা হচ্ছে বলে তারা জানান।

বদলির চার ফাইল

বদলিকামী চিকিৎসক ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বদলির চারটি ফাইল তারা দেখেছেন চারজনের নামে। অধিদপ্তরের তিন ও চারতলার দুটি কক্ষে এসব বদলির নিয়ন্ত্রণ হয়। এ চারজনের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাচিপের সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাকি দুজন স্বাচিপপন্থি বা স্বাচিপের সুবিধাভোগী ছিলেন না। এ চারজনের তিনজনকেই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তাদের একজন আবার ঢাকার একটি হাসপাতালে ফিরে এসেছেন। বাকি দুজন এখনো বদলি করা জায়গায় যোগ দেননি। একজন আগে থেকেই অধিদপ্তরে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কেউ বদলি হতে চাইলে তাকে এ চারজনের ফাইলের যেকোনো একটিতে নাম তুলতে হবে, না হলে বদলি হবে না।

প্রতি বদলিতে গড়ে ২ লাখ টাকা

বদলিতে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিকিৎসকরা জানান, দুই হাজার বদলির মধ্যে অর্ধেকের বেশি টাকা দিয়ে হয়েছে।

বদলিবাণিজ্যের উদাহরণ দিয়ে অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজনকে দিয়ে আমি আমার দুই বন্ধুকে বদলি করিয়েছি। তার অর্ডারের ভ্যালু ছিল ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। আরেক বন্ধু ঢাকায় বদলি হয়েছেন ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকায়।’

অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘সর্বশেষ জামালপুর ও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় দুজনের তথ্য পাওয়া গেছে। জামালপুরের যাকে বদলি করা হয় তাকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকায় বদলি করা হয়; এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তাকে জামালপুরে পাঠানো হয়। কারণ, ঢাকার হাসপাতালের ওই পোস্ট আগেই আরেকজনের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। আর মুন্সীগঞ্জের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে বদলি হতে লাগে ৫০ হাজার টাকা।’

সরকারের গচ্চা ৪ কোটি টাকা

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বদলি করা প্রত্যেক চিকিৎসকের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে-আসতে টিএ-ডিএ বিল ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। স্থানভেদে কাউকে ৩০ হাজারও দেওয়া হয়। দুই হাজার বদলিতে গড়ে ২০ হাজার টাকা করে টিএ-ডিএ বিল হিসেবে ৪ কোটি টাকার বেশি চলে গেছে। এটা সরকারের অপচয়। এ টাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরো বছর চলে যেত।

আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বদলি

অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা জানান, আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রতি সপ্তাহে ৫০-৬০টি বদলির আদেশ হতো না; খুব বেশি হলে ১০০। সেখানে দুই হাজার বদলি হয়েছে মাত্র এক মাসে। তার মানে আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বদলির ঘটনা ঘটেছে।

অধিদপ্তরের বদলির আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩১ অক্টোবর এক দিনেই ২৯টি আদেশের মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে ২৪৭ জনকে; নভেম্বরের ১১ দিনে ১ হাজার ৪৬৮ জনকে ও ডিসেম্বরের প্রথম দুদিনে ৪১ জনকে।

এক দিনে সর্বোচ্চ বদলির ঘটনা ঘটেছে ১৩ নভেম্বর; ৩১টি আদেশের মাধ্যমে ৩০৬ জনকে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ অক্টোবর; ৩০টি আদেশের মাধ্যমে ২৬৭ জনকে ও তৃতীয় সর্বোচ্চ ১ নভেম্বরে ২৮টি আদেশের মাধ্যমে ২৫৪ জনকে।

এ ছাড়া ২৭ নভেম্বর ১৭টি আদেশের মাধ্যমে ২৩৫ জনকে, ২৫ নভেম্বর ১৬টি আদেশের মাধ্যমে ২০১, ৬ নভেম্বরে ১৭টি আদেশের মাধ্যমে ১৫০, ১৯ নভেম্বর ১১টি আদেশের মাধ্যমে ৮৩, ৫ নভেম্বর ৭টি আদেশের মাধ্যমে ৬৪ ও ৩ নভেম্বর ৮টি আদেশের মাধ্যমে ৪৭ জনকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।