ব্যাংক খাতে ব্যর্থতার দায় কমবেশি সবার

ব্যাংক খাত ব্যর্থতায় সবারই দায় আছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ব্যাংকসহ দেশের আর্থিক খাত গত ৫৩ বছরে অনেক দূর এগিয়েছে। তবে যতদূর এগোনোর কথা ছিল, ততদূর এগোতে পারেনি। আমাদের সবার আলাদা আলাদা দায়িত্ব ছিল। সবাই হয়তো সেই দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে আত্মসমালোচনা করা দরকার।

গতকাল রবিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গোল্ডেন জুবিলি উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক খাতে অর্জন যেমন আছে, তেমনি ব্যর্থতাও আছে। এই ব্যর্থতার জন্য শুধু একক কোনো গোষ্ঠী দায়ী নয়, এ ক্ষেত্রে সবারই কমবেশি দায় আছে। তবে ব্যাংকিং খাত দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে। এ খাত বিকশিত হবে। সে ক্ষেত্রে আমানতকারী এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি নৈতিকতা বোধ বৃদ্ধির চর্চা চালু করতে হবে। তা না হলে অর্থই অনর্থের মূলে পরিণত হবে। কারণ ব্যাংক পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সৎ, মানবিক ও নৈতিক ব্যাংকারের প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এজন্য সবুজ ব্যাংকিং ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনেক ফান্ড পড়ে আছে, এগুলো নিতে ব্যাংকগুলো আগ্রহ দেখায় না। এ জায়গায় থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে জলবায়ু ও গ্রিন ফাইন্যান্সিং নিয়েও বিআইবিএমকে কাজ করতে হবে। সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বাদ দিয়ে ব্যাংক খাত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। এজন্য এসএমই ও গ্রিন ফাইন্যান্স নিয়ে ট্রেনিং দিতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরির্বতনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব হওয়ার দিকে এগোতে হবে।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে নতুনভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তবে সুশাসনের বদলে অপশাসন থাকবে তা কিন্তু হবে না। গত ৫ আগস্টের আগে ব্যাংক খাতে কতটা দুর্নীতি হয়েছে, তা সবাই জানে। গত ১৫ বছরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে। এসব খাতে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিআইবিএমের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক আক্তারুজ্জামান বলেন, আজ বিআইবিএমের এক অবিস্মরণীয় দিন। ৫০ বছর আমাদের অঙ্গীকার সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। আইএফএসি, বিশ^ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে গবেষণা করেছি। অনেক ক্ষেত্রে বিআইএম নিজের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি বলেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য এখনো পর্যন্ত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশে সার্বিকভাবে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের বিকাশের জন্যও সহায়ক নয়। ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য সম্পূর্ণ আর্থিক খাতকে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতকে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দায়িত্ব নিতে হলে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদে এ-সংক্রান্ত কর্মক্ষমতা এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যবস্থাগত দুর্বলতার দায়িত্ব নিয়ে, চিহ্নিত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা নিশ্চিত করার বিকল্প আছে বলে মনে করি না।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালক নিয়োগের বিধিমালা পর্যালোচনা করতে হবে এবং পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের অধিকতর ভূমিকা এবং সব পরিচালকের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু বহুল প্রচলিত শব্দ খুব সাধারণ মনে হলেও তা ব্যাংক সুশাসন সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ‘মালিক’ বা ‘মালিকপক্ষ’ শব্দগুলো ব্যাংক খাতে ব্যবহার না করে, পৃষ্ঠপোষক বা শেয়ারহোল্ডার ব্যবহার করা যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। ব্যাংক ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থে চলে এবং প্রিন্সিপাল হিসেবে আমানতকারীরাই ব্যাংকের মূল অংশীদার এ ধারণা ‘আর্থিক স্বাক্ষরতা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রচার করা প্রয়োজন। ‘সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক’ বা ‘বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘সরকারি খাতে পরিচালিত ব্যাংক’ এবং ‘বেসরকারি খাতে পরিচালিত ব্যাংক’ যুক্তিপূর্ণ শব্দ। সরকারি খাতে পরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিযোগিতা এবং ন্যায্যতার স্বার্থে, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক (সরকারি এবং বেসরকারি) অভিন্নভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো, পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের আওতায় থাকবে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে অপরাধ এবং দুর্নীতির মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের এ মূল স্তম্ভের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটাই সত্য যে, বেশ কিছু বড় ঋণখেলাপি কর্তৃক গ্রাহকের সঞ্চিত টাকা অপব্যবহারের কারণে সমগ্র আর্থিক খাতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি কখনো এক কাতারে বিবেচিত হতে পারে না। অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের সহায়তা করা সংশ্লিষ্টদের নৈতিক দায়িত্ব। ব্যাংক সুশাসনের পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের আইনের আওতায় এবং সামাজিক চাপের মধ্যে আনার কোনো বিকল্প নেই। সমস্যা সমাধানে বাস্তবায়নযোগ্য আইনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হরণ’ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।